হরমুজ প্রণালির সিদ্ধান্ত গ্রহণে ওমানের সঙ্গে প্রভাবের লড়াইয়ে ইরান
হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার হলো এই জলপথ। তাই এটি যে বিরোধের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু হবে, তা অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। মাত্র ২৪ মাইল প্রশস্ত এই প্রণালির প্রতিটি অংশ এখন ক্ষমতার লড়াই ও ধৈর্যের পরীক্ষার মঞ্চে পরিণত হয়েছে
হরমুজ প্রণালির সিদ্ধান্ত গ্রহণে ওমানের সঙ্গে প্রভাবের লড়াইয়ে ইরান
হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার হলো এই জলপথ। তাই এটি যে বিরোধের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু হবে, তা অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। মাত্র ২৪ মাইল প্রশস্ত এই প্রণালির প্রতিটি অংশ এখন ক্ষমতার লড়াই ও ধৈর্যের পরীক্ষার মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
ইরানের জন্য এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকাও সমস্যা নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে না।
১৮ জুন ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেওয়ার পরই কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। তবে অবরোধ তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের ওপর কেবল "সর্বোচ্চ চেষ্টা" করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে অবরোধ যত দীর্ঘ হবে, ততই যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসবে। যদিও মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত ইরানি জনগণের চাপ সরকারকে একসময় কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে, তবুও এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
ইরান এই সমঝোতার সর্বোচ্চ সুবিধাজনক ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছে এবং ঘোষণা দিয়েছে, কেবল তারাই হরমুজের অবরোধ প্রত্যাহার করতে পারে। এ কারণে তারা অন্য কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্পৃক্ততাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করছে।
এই কারণেই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO) এবং ওমানের সহযোগিতায় প্রস্তাবিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিকল্প নৌপথ ইরান প্রত্যাখ্যান করে। পরিকল্পনা ছিল, কেন্দ্রীয় নৌপথে মাইন থাকার কারণে দুটি নতুন পথ চালু করা হবে—একটি ওমানের জলসীমায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের Joint Maritime Information Center তত্ত্বাবধান করবে, এবং অন্যটি ইরানের উপকূলঘেঁষা উত্তরাঞ্চলে।
আইএমও ধারণা করেছিল, এ পরিকল্পনায় ইরানের সম্মতি রয়েছে। কিন্তু পরে হয় ইরানের বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র ভিন্ন অবস্থান নেয়, অথবা আইএমও ইরানের নমনীয়তাকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিল। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ দিয়ে চলাচলরত একটি সিঙ্গাপুরের জাহাজে ইরানের হামলার পর আইএমও পরিকল্পনাটি স্থগিত করে।
ইরানের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে যুদ্ধ-পূর্ব শর্তে আলোচনায় ফিরে যাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত চাপ সৃষ্টির সুযোগ হারানো।
বাগদাদে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন,
"ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বর্তমান প্রচেষ্টার বাইরে নতুন বা পৃথক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা কেবল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে বিলম্ব ঘটাবে এবং উত্তেজনা বাড়াবে।"
তবে দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ নিয়ে এই বিরোধের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান যে পরিকল্পনা তৈরি করেছে, সেটিও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যেই ওমান এই পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে নিরপেক্ষ কূটনীতির দেশ ওমান এখন কঠিন অবস্থানে রয়েছে। একদিকে, যদি তারা ইরানের আপত্তি উপেক্ষা করে, তাহলে তেহরান ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সমর্থন নাও দিতে পারে। অন্যদিকে, যদি তারা হাজারো আটকে পড়া নাবিককে উদ্ধারে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে তাদের পরিকল্পনা আঞ্চলিক দেশ ও জাতিসংঘের সমর্থন হারাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি ওমানের রাজধানী মাসকাটে দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আব্দুলআজিজ আল-হিনাই–এর সঙ্গে যৌথ বৈঠক করেছেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইরান একক কর্তৃত্ব দাবি করতে পারছে না।
ওমানের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে উপকূলবর্তী দেশগুলো আয় করবে, তবে তা বাধ্যতামূলক টোল হিসেবে নয়; বরং স্বেচ্ছা অনুদান বা নৌ-নির্দেশনা ও নিরাপত্তাসেবার বিনিময়ে বৈধ সেবা-ফি হিসেবে নেওয়া হবে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি বলেন,
"হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ওপর টোল আরোপের পক্ষে আমরা নই, কারণ আন্তর্জাতিক আইন তা নিষিদ্ধ করেছে। তবে নৌ-সেবা বাবদ ফি নেওয়া বৈধ, এবং এ বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।"
সমুদ্র আইন (UNCLOS)-এর ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল প্রণালি অতিক্রমের জন্য টোল নেওয়া নিষিদ্ধ। তবে ৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যবহারকারী রাষ্ট্র ও উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোকে যৌথভাবে নৌ-নিরাপত্তা ও অন্যান্য সামুদ্রিক সেবার অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ–এর সঙ্গে বৈঠকে ওমানের সুলতানও এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে, ম্যাক্রোঁ ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি নৌবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি রেখেছেন। তবে ওমানের সুলতানের যুক্তি, যদি পশ্চিমা দেশগুলো ওমানের প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাহলে এমন নৌবাহিনীর প্রয়োজন হবে না।