ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবনের খোঁজ, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্ধার অভিযান

ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত উত্তর ভেনেজুয়েলায় শুক্রবার জীবিতদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করেছেন উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ইট-পাথরের বিশাল ধ্বংসস্তূপ খালি হাতে সরিয়ে তারা আটকে পড়াদের ক্ষীণ আওয়াজ শোনার চেষ্টা করেন এবং আরও মানুষকে জীবিত উদ্ধারের আশায় প্রার্থনা করেন

PostImage

ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবনের খোঁজ, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্ধার অভিযান


ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত উত্তর ভেনেজুয়েলায় শুক্রবার জীবিতদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করেছেন উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ইট-পাথরের বিশাল ধ্বংসস্তূপ খালি হাতে সরিয়ে তারা আটকে পড়াদের ক্ষীণ আওয়াজ শোনার চেষ্টা করেন এবং আরও মানুষকে জীবিত উদ্ধারের আশায় প্রার্থনা করেন।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যের একটি ছোট হাসপাতালে ১৭ বছর বয়সী হুয়ান ডেভিড আরসিয়া জানান, তিনি ২১ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি আমার মায়ের সঙ্গে ছিলাম। আমি তাঁর চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি বারবার বলছিলাম, ‘মা, হাল ছেড়ো না, বিশ্বাস রাখো।’” ভাঙা পা নিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা অবস্থায় তিনি অন্যদের আর্তনাদও শুনেছিলেন, কিন্তু গভীর রাতে সেই শব্দ থেমে যায়। পরে উপরে মানুষের চলাচলের শব্দ শুনে চিৎকার করলে প্রতিবেশীরা তাঁকে ও তাঁর মাকে উদ্ধার করেন।

বুধবারের ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী যুগ্ম ভূমিকম্পের পর অন্তত ১০টি দেশের উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সড়ক ফেটে যাওয়া এবং দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া অবকাঠামো উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। ভারী যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের কারণে অনেক মানুষকে নিজেদের উদ্যোগেই ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে হয়েছে।

ক্রমাগত শত শত আফটারশকের কারণে বহু মানুষ নিজেদের বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেকে খোলা মাঠ, পার্ক কিংবা মহাসড়কের পাশে রাত কাটাচ্ছেন, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ।

৭০ বছর বয়সী আর্সেনিয়া বেয়াত্রিজ মায়োরা তাঁর পরিবারের ১০ সদস্যকে নিয়ে লা গুয়াইরার একটি বেসবল মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানান, তাঁদের বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং শুধু সামনের অংশটি দাঁড়িয়ে আছে। তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে সরকারি সহায়তার তেমন কোনো উপস্থিতি ছিল না; অধিকাংশ ত্রাণসামগ্রী স্থানীয় বাসিন্দারাই এনে দিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের নেতা হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে এবং ৩,৩৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। আরও অন্তত ১৭২ জন এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ১,৪০০টিরও বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি হাসপাতাল ও ২৫টি শপিং সেন্টার রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও ঘোষণা দেন যে, লা গুয়াইরা এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হবে এবং সেখানে সড়ক পরিষ্কারসহ উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা জীবিতদের উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই “গোল্ডেন উইন্ডো”র মধ্যেই সর্বাধিক মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, এল সালভাদর, মেক্সিকো, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রও ৩০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী পাঠিয়েছে। এছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনী পরিবহন বিমান, নৌবাহিনীর জাহাজ ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে এবং মানবিক সহায়তার জন্য ১৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। ভূমিকম্প-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন সহজ করতে ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে।

সরকারি সমালোচনার মুখে ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপ সরাতে ১০০টিরও বেশি ভারী যন্ত্র এবং ৫,০০০-এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও দেশের বিভিন্ন স্থানে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। রাজধানী কারাকাসের মর্গে স্বজনদের খোঁজে মানুষের দীর্ঘ সারি, হাসপাতালে আহতদের ভিড় এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্নায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর