ইরানের অনুগতরা আরও বিস্তৃত জাতীয়তাবাদের প্রচার করছে, যেখানে হিজাববিহীন নারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে

ইরানের সরকার ও তাদের সমর্থকেরা এমন এক নতুন জাতীয়তাবাদী বার্তা তুলে ধরছে, যেখানে আগে সরকারের বিরোধিতা করা বা ভিন্নমত পোষণকারী মানুষদেরও এখন জাতীয় ঐক্যের অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো—দেশের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভুলে বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে সবাইকে একত্রিত দেখানো

PostImage

ইরানের অনুগতরা আরও বিস্তৃত জাতীয়তাবাদের প্রচার করছে, যেখানে হিজাববিহীন নারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে


ইরানের সরকার ও তাদের সমর্থকেরা এমন এক নতুন জাতীয়তাবাদী বার্তা তুলে ধরছে, যেখানে আগে সরকারের বিরোধিতা করা বা ভিন্নমত পোষণকারী মানুষদেরও এখন জাতীয় ঐক্যের অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো—দেশের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভুলে বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে সবাইকে একত্রিত দেখানো।

একটি ভাইরাল ভিডিওতে গোলাপি পোশাক ও জিন্স পরা, খোলা চুলের এক তরুণীকে দেখা যায়। তিনি দাবি করেন, আগে তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র বা সর্বোচ্চ নেতার সমর্থক ছিলেন না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তিনি মত পরিবর্তন করেছেন এবং বলেন, “যদি বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ বাহিনী লড়াই না করত, তাহলে আমরা আজ এখানে থাকতাম না।” যদিও ওই নারীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি এবং তার বক্তব্য কতটা স্বতঃস্ফূর্ত, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের পর টিকে থাকা এবং চলমান শান্তি আলোচনায় শক্ত অবস্থান অর্জনের কারণে ইরানের সরকার নিজেদের আরও আত্মবিশ্বাসী মনে করছে। তবে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে দেশটি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

এই পরিস্থিতিতে সরকার জনগণের মধ্যে বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন বার্তা দিচ্ছে—সরকারপন্থী ও বিরোধীরা সবাই মিলে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে, যেখানে কথিত সাবেক বিক্ষোভকারী, আধুনিক পোশাক পরা তরুণ-তরুণী বা হিজাববিহীন নারীদেরও সরকার ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তাগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন হলেও এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে সরকার এখন নিজেদের আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপে উপস্থাপন করতে চাইছে। অথচ একই সময়ে সমালোচকদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হিজাব এখনও ইরানে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক এবং তা লঙ্ঘনের জন্য নারীরা গ্রেপ্তার বা শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন। তবুও রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় হিজাববিহীন নারী এখন আগের তুলনায় বেশি দেখা যায়। সম্প্রতি সরকারপন্থী সমাবেশেও তাদের উপস্থিতি প্রচার করা হচ্ছে, যা অতীতে খুবই বিরল ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষকেরা মনে করেন, আগে বাধ্যতামূলক হিজাব ছিল সরকারপন্থী ও বিরোধীদের মধ্যে অন্যতম বড় বিভাজন। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর সেই বিভাজনের জায়গায় বিদেশি হুমকির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে অনেক সমালোচক এই পরিবর্তনকে কৌশলগত ও সাময়িক বলে মনে করেন। তাদের অভিযোগ, যে সরকার আগে হিজাব না পরার কারণে নারীদের শাস্তি দিয়েছে, সেই সরকারই এখন রাজনৈতিক সুবিধার জন্য একই ধরনের নারীদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানি সমাজ আগের চেয়ে আরও বিভক্ত। কেউ সরকারবিরোধী হয়েও বিদেশি সামরিক হামলার বিরোধিতা করছেন, আবার কেউ সরকার পরিবর্তনের আশায় সেই হামলাকে সমর্থন করছেন। একইভাবে সরকারপন্থীদের মধ্যেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ও সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাত শেষ করার প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে।

তেহরানে অবস্থানরত সাংস্কৃতিক বিশ্লেষক রয়্যা খোশনেভিসের ভাষায়, জাতীয়তাবাদ দিয়ে সব বিভাজন দূর করা সম্ভব নয়, তবে যুদ্ধ টিকে থাকার অভিজ্ঞতা অনেক ইরানির মধ্যে এক ধরনের সম্মিলিত গর্বের অনুভূতি তৈরি করেছে। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধের চাপ কমে গেলে সরকার আবারও আগের মতো কঠোর অবস্থানে ফিরে যেতে পারে।

সবশেষে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান মন্তব্য করেন, সমাজের ভিন্নমত ও পার্থক্যকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে মেনে নেওয়া উচিত এবং জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে সেগুলোকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর