তৈরি পোশাক খাতে খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণ: কর ফাকি, টাকা পাচার ও অব্যবস্থপনায় ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে প্রবল ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত বর্তমানে ভয়াবহ খেলাপি ঋণ সংকটে পড়েছে। একদিকে রপ্তানি আয় বাড়ছে, অন্যদিকে একই খাতের ঋণখেলাপি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে

PostImage

তৈরি পোশাক খাতে খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণ: কর ফাকি, টাকা পাচার ও অব্যবস্থপনায় ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে প্রবল ঝুঁকি


বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত বর্তমানে ভয়াবহ খেলাপি ঋণ সংকটে পড়েছে। একদিকে রপ্তানি আয় বাড়ছে, অন্যদিকে একই খাতের ঋণখেলাপি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৪ এবং সাম্প্রতিক আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই খাত এখন সবচেয়ে বড় ঋণখেলাপি খাতগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র

২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তৈরি পোশাক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। খাতটিতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ২৬ শতাংশ এখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের শেষে এই অঙ্ক ছিল ২২ হাজার ৭০২ কোটি টাকা।

টেক্সটাইল খাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৬ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ দেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পখাতের বড় অংশই এখন ঋণ পরিশোধে অক্ষম অবস্থায় রয়েছে।

রপ্তানি আয় বাড়লেও বাড়ছে খেলাপি

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রপ্তানি আয় বাড়লেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি।

কিন্তু একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১৪ শতাংশের বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুফল প্রকৃত আর্থিক স্থিতিশীলতায় প্রতিফলিত হচ্ছে না। উৎপাদন ব্যয়, সুদের চাপ এবং বৈদেশিক বাজারের অনিশ্চয়তা অনেক কারখানাকে ঋণ পরিশোধে অক্ষম করে তুলছে।

কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ?

বিশেষজ্ঞরা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ চিহ্নিত করেছেন।

১. ঋণ শ্রেণিকরণে কঠোরতা

দীর্ঘদিন ব্যাংকগুলো নানা কৌশলে ঋণ “নিয়মিত” দেখিয়ে আসছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা কঠোর করায় প্রকৃত খেলাপি ঋণ সামনে চলে এসেছে। “পেপার রেগুলারিটি” বা কাগজে-কলমে ঋণ নিয়মিত রাখার সুযোগ কমে যাওয়ায় বহু প্রতিষ্ঠান এখন আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

২. বৈশ্বিক বাজারে চাপ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ শুল্ক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়ায় অনেক কারখানার ক্রয়াদেশ কমেছে। ফলে নগদ প্রবাহে সংকট তৈরি হয়েছে।

৩. উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুনাফার হার কমে গেছে। অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন।

৪. টাকা পাচার ও আর্থিক অনিয়ম

অনেক বড় শিল্পগ্রুপের বিরুদ্ধে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি-রপ্তানির মূল্য কারসাজি, ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং এবং শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে।

৫. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা,  রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকি, যত্রতত্র প্রতিষ্ঠানিক হামলা ও ব্যবসায়িক দ্বন্দে উস্কে দেওয়া মবও এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে দায়ী।

যেভাবে টাকা পাচার হয়

অর্থনীতিবিদ ও তদন্ত সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পোশাক খাতে “ট্রেড-বেজড মানি লন্ডারিং” এখন বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

প্রধান কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে:

রপ্তানির প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে বিদেশে অর্থ রেখে দেওয়া।

আমদানির মূল্য অতিরিক্ত দেখিয়ে এলসির মাধ্যমে বাড়তি টাকা বিদেশে পাঠানো।

ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া আমদানি দেখানো।

বিদেশে নিজস্ব ট্রেডিং কোম্পানির মাধ্যমে ট্রান্সফার প্রাইসিং।

রপ্তানি আয় নির্ধারিত সময়ে দেশে না এনে বিদেশি অ্যাকাউন্টে জমা রাখা।

কর ফাঁকির অভিযোগও বাড়ছে

পোশাক খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সূত্র বলছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, ভুয়া ব্যয় দেখানো, দ্বৈত হিসাবপত্র এবং বিদেশি কমিশনের নামে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে।

বড় শিল্পগ্রুপের নাম উঠে আসছে

সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় কয়েকটি বড় শিল্পগ্রুপের নাম এসেছে।

এর মধ্যে রয়েছে:

এস আলম গ্রুপ

বেক্সিমকো গ্রুপ

কেয়া গ্রুপ

গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং

ম্যাগপাই নিটওয়্যার

সুপ্রভ কম্পোজিট নিট

সরকার ইতোমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ অনুসন্ধান এবং অর্থ পাচার তদন্ত শুরু করেছে।

বন্ধ হচ্ছে কারখানা, বাড়ছে কর্মসংস্থান ঝুঁকি

বিজিএমইএ সূত্র অনুযায়ী, ব্যাংক ঋণ সংকট ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে। এতে কয়েক লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকিং খাত—সবখানেই বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

২০২৬ এর বাস্তবতায় দেখা যায়, ব্যাংকগুলো এই বৃহৎ খেলাপী ঋনের ফাঁদে ভয়ংকর চাপে রয়েছে। নানা অজুহাতে বন্ধ করে প্রতিষ্ঠান মালিকারা দেশত্যাগ করছে এমনকি ক্ষতির পরিমান অধিক দেখিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছে। 

সরকারের করণীয় কী?

অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা

রপ্তানি আয়ের অর্থ দেশে ফেরত আনা নিশ্চিত করা

ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো

বন্ড ও এলসি ব্যবস্থায় ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো

দুর্বল কারখানাগুলোর জন্য পুনর্গঠন সহায়তা

খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহার বন্ধ করা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এখন দ্বৈত বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে এটি দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ সরবরাহ করছে, অন্যদিকে একই খাত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির উৎসে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সংস্কার ও কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ছাড়া এই সংকট ভবিষ্যতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর