বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়েতের ইতিহাস বিকৃতিসহ ভয়ংকর অপপ্রচার: সত্য ইতিহাসকে ঢেকে ফেলার অপকৌশল
৫ আগষ্ট পরবর্তী ক্ষমতায়নের এ সময়কালে জামায়াত তাদের ৭১ এর অবস্থানকে সঠিক ও রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দাড় করানোর জন্য মিডিয়া সভামঞ্চ থকে শুরু করে সংসদেও ইতিহাস বিকৃতি ও মনগড়া মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ তৈরি করে বক্তব্য দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর ফলে বঙ্গবন্ধু, শহীদদের সংখ্য ও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিকৃতি অপতথ্য ছড়াচ্ছে তাদের সমর্থকরা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বিপরীতমুখী বর্ণনা দেওয়াই যেন তাদের মূল এজেন্ডা
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়েতের ইতিহাস বিকৃতিসহ ভয়ংকর অপপ্রচার: সত্য ইতিহাসকে ঢেকে ফেলার অপকৌশল
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে গত পাঁচ দশকে নানা রাজনৈতিক বিতর্ক, অপপ্রচার ও ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। ২৪ এর আন্দোলনে আওয়ামীলীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপি জামায়াত ইসলাম পরষ্পর জোট ভেঙ্গে সরকার গঠন করেছে। ইতিহাসে প্রথম জামায়াত ইসলাম মূল ধারার রাজনীতিতে বড় দল হিসেবে বিরোধী দলীয় ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়াও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াতকে সবচেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগষ্ট পরবর্তী ক্ষমতায়নের এ সময়কালে জামায়াত তাদের ৭১ এর অবস্থানকে সঠিক ও রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দাড় করানোর জন্য মিডিয়া সভামঞ্চ থকে শুরু করে সংসদেও ইতিহাস বিকৃতি ও মনগড়া মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ তৈরি করে বক্তব্য দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর ফলে বঙ্গবন্ধু, শহীদদের সংখ্য ও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিকৃতি অপতথ্য ছড়াচ্ছে তাদের সমর্থকরা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বিপরীতমুখী বর্ণনা দেওয়াই যেন তাদের মূল এজেন্ডা ।
ইতিহাসবিদদের মতে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা ও মতভেদ গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক। তবে কোনো দাবি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক দলিল, সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সংবাদ, কূটনৈতিক নথি এবং গবেষণাভিত্তিক তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণা
বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি হলো ৭ মার্চের ভাষণ এবং স্বাধীনতার ঘোষণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রচারণায় দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হয়েছে যে তিনি ভাষণ শেষে "পাকিস্তান জিন্দাবাদ" বলেছিলেন অথবা স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে চাননি।
তবে সংরক্ষিত অডিও-ভিডিও, ভাষণের পূর্ণাঙ্গ প্রতিলিপি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নথিতে এমন কোনো তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং ভাষণটি শেষ হয় "জয় বাংলা" স্লোগানের মাধ্যমে। ২০১৭ সালে UNESCO ভাষণটিকে Memory of the World International Register-এ অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে ভাষণটিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম. এ. জি. ওসমানীসহ একাধিক মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে, ৭ মার্চের ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২৫ মার্চের গ্রেপ্তার: আত্মসমর্পণ নাকি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত?
আরেকটি বহুল প্রচারিত অভিযোগ হলো, বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাতে স্বেচ্ছায় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
তবে সমসাময়িক গবেষণা ও ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং সেখানে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গোপন সামরিক আদালতে বিচার শুরু করে। সে সময় BBC, Reuters এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাঁর বিচার ও সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের খবর প্রকাশ করে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, বঙ্গবন্ধুর আত্মগোপনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও কৌশলগত ছিল, যদিও এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক নথির মূল্যায়ন
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্ব জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মার্কিন কূটনীতিক Archer K. Blood-এর ঐতিহাসিক Blood Telegram পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের কঠোর সমালোচনা করে। একইভাবে সাংবাদিক Anthony Mascarenhas তাঁর বিখ্যাত Genocide প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার বিবরণ প্রকাশ করেন। আর সাংবাদিক Simon Dring ঢাকায় অবস্থান করে ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষ বিবরণ আন্তর্জাতিক পাঠকের সামনে তুলে ধরেন।
রক্ষীবাহিনী নিয়ে বিতর্ক
স্বাধীনতার পর গঠিত জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, বাহিনীটি রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে ব্যবহৃত হয়েছিল।
অন্যদিকে গবেষকদের মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বাহিনীটি গঠন করা হয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ হত্যা বা গুমের মতো প্রচলিত দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিলভিত্তিক প্রমাণ ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত নয়।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও বাকশাল নিয়ে অপপ্রচার
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং পরবর্তীকালে বাকশাল গঠন।
অর্থনীতিবিদ Amartya Sen-এর দুর্ভিক্ষবিষয়ক গবেষণাসহ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দুর্ভিক্ষ কেবল খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতির কারণে নয়; বন্যা, খাদ্য বণ্টনব্যবস্থা, বাজারব্যর্থতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাকশাল গঠন করেন। সমালোচকরা এটিকে একদলীয় শাসনব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করলেও, সমর্থকদের মতে এটি ছিল জাতীয় সংকট মোকাবিলার একটি সাময়িক রাজনৈতিক কাঠামো। এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপপ্রচার
বঙ্গবন্ধুর পরিবার, বিশেষ করে শেখ কামাল ও শেখ জামালকে ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি ও অপরাধের অভিযোগ প্রচারিত হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বড় অংশই রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা প্রচারণার অংশ হিসেবে ইতিহাসে উল্লেখিত। নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও আদালতে প্রতিষ্ঠিত প্রমাণের অভাবের কথাও অনেক গবেষক তুলে ধরেছেন। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত জীবনযাপন তুলনামূলকভাবে সাদামাটা ছিল বলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পর্যবেক্ষক তাঁদের স্মৃতিচারণ ও গবেষণায় উল্লেখ করেছেন।
ইতিহাসবিদদের মূল্যায়ন
গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা। তাঁর নীতি, সিদ্ধান্ত ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা, পুনর্মূল্যায়ন ও বিতর্ক ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক অংশ। তবে ইতিহাস বিকৃতি, তথ্যহীন প্রচারণা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার থেকে ইতিহাসকে পৃথক রাখতে প্রাথমিক দলিল, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথা এবং নির্ভরযোগ্য গবেষণার ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছেন ইতিহাসবিদরা।