আফগান অভিজ্ঞতা: আধুনিক সামরিক শক্তি সবসময় চূড়ান্ত জয় নিশ্চিত করে না

আফগানিস্তানকে বহু সময় ধরে “সাম্রাজ্যের কবরস্থান” বলা হয়ে এসেছে। ব্রিটিশ, সোভিয়েত ও মার্কিন সামরিক শক্তি বহুবার দেশটিতে প্রবেশ করলেও দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং দেশটির দুর্গম ভূগোল, শক্তিশালী উপজাতীয় কাঠামো, কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বাইরের শক্তির জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও সংঘাত সম্ভাবনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উদ্ভূত হচ্ছে।

PostImage

আফগান অভিজ্ঞতা: আধুনিক সামরিক শক্তি সবসময় চূড়ান্ত জয় নিশ্চিত করে না


আশিকুর রহমান:  আফগানিস্তানকে বহুদিন ধরেই সাম্রাজ্যের কবরস্থান বলা হয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য উনিশ শতকে একাধিকবার আফগান ভূখণ্ডে প্রবেশ করলেও দীর্ঘমেয়াদে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালে সামরিক শক্তি নিয়ে প্রবেশ করে প্রায় এক দশক যুদ্ধ চালিয়েও শেষ পর্যন্ত সরে যেতে বাধ্য হয়। ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট তালেবান সরকারকে উৎখাত করলেও দুই দশক পর তাদেরও বিদায় নিতে হয় এবং তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে অনেকে মনে করেন আফগানিস্তানকে জয় করে রাখা যায় না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন এটি পুরোপুরি অলৌকিক বা রহস্যময় কোনো বিষয় নয়; বরং দেশটির দুর্গম পাহাড়ি ভূগোল, শক্তিশালী উপজাতীয় সামাজিক কাঠামো, কেন্দ্রীয় শাসনের ঐতিহাসিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বাইরের শক্তির জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিশ্ব সামরিক শক্তির সূচকে পাকিস্তান শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে, অন্যদিকে আফগানিস্তান অনেক নিচের দিকে। অস্ত্রভাণ্ডার, জনবল, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের দিক থেকে দুই দেশের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে সামরিক র‌্যাঙ্কিং সবসময় যুদ্ধের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে না। স্থানীয় সমর্থন, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ, ভূখণ্ডের সুবিধা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় উন্নত প্রযুক্তিকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

এদিকে পাকিস্তান বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণচাপ, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি আফগান সীমান্ত ইস্যু, তেহরিক ই তালেবান পাকিস্তানের কার্যক্রম এবং বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা দেশটির নিরাপত্তা পরিবেশকে জটিল করে তুলেছে। যদিও পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং উল্লেখযোগ্য সামরিক অবকাঠামো ধারণ করে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গত এক দশকে বেড়েছে। যৌথভাবে তৈরি যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রযুক্তি, নৌ সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় চীনা অবদান স্পষ্ট। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে অস্ত্রের উৎস পরিবর্তন বা আধুনিকায়ন একাই কৌশলগত সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতে কূটনৈতিক সমীকরণ, অর্থনৈতিক স্থিতি, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দক্ষিণ এশিয়ায় একাধিক ফ্রন্টে বড় আকারের যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা সরাসরি সংঘাতকে নিরুৎসাহিত করে। ফলে সামরিক শক্তির প্রদর্শন ও সীমিত উত্তেজনা থাকলেও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

সব মিলিয়ে আফগানিস্তানের অতীত অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতিহাস বলছে শুধু শক্তি প্রয়োগ নয়, রাজনৈতিক সমঝোতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতি নিশ্চিত করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে সামরিক প্রতিযোগিতার চেয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্য ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর।