ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে—প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য
ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৭ মাসে দেশের গণমাধ্যম, শিক্ষা, শিল্প, আর্থিক খাত, আইন-শৃঙ্খলা এবং উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মব ভায়োলেন্স, বিনিয়োগ হ্রাস এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে রাষ্ট্রের মৌলিক খাতগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নতুন সরকারের জন্য এসব ক্ষতিগ্রস্ত খাত পুনরুজ্জীবিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে—প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৭ মাসে (২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) দেশের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক খাত এবং স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন মানবাধিকার ও সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর উন্নয়নে সরকার ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার বিজ্ঞ ব্যক্তিগন মনে করছেন। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো-
গনমাধ্যম-
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। মব ভায়োলেন্স বা জনরোষের হামলায় দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবন আক্রান্ত হয়। এছাড়া ১৭ মাসে সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলার ঘটনা ঘটে এবং ৬ জন সাংবাদিক নিহত হন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
মব ভায়োলেন্স, ট্যাগিং, ভিন্ন মতাদর্শকে দমন, রাজনৈতিক হয়রানি ও অযোগ্য লোকদের পদায়নের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কুল পর্যন্ত যে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো ধ্বংস তার মানসম্মত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরী। জরীপে দেখা ১৫০ জনেরও বেশি শিক্ষককে জোর পূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় যার মধ্যে ৪৯ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এবং ৫৬ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন উপাচার্যকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শারিরিকভাবে লাঞ্ছিতের স্বীকার হয় শিক্ষকরা।
শিল্প ও পোষাক খাত: একের পর এক শিল্প প্রতিষ্ঠান ও গার্মেন্টস এ অগ্নিসংযোগ ভাংচুর, মব ভায়োলেন্স ও চাদাবাজির কারনে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫ আগষ্ট পরবর্তী অস্থিরতায় শিল্প উৎপাদন ৪০% থেকে কমে ১০% এ নেমে আসে। প্রায় ১৮৩ টি গার্মেন্টস, ৩৬ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান সাময়িক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই খাতে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
দূর্নীতির সূচকে অবনতি.....
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচক (CPI) অনুযায়ী, ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৩তম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় (১৪তম) এক ধাপ অবনতি । টিআইবি-র মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হতে পারেনি।
উন্নয়ন প্রকল্প....
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈদেশিক সাহায্যের অভাবে ১০০টিরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে । এর মধ্যে ভারতের ক্রেডিট লাইনের অধীনে থাকা ১৫টি রেল ও সড়ক প্রকল্প এবং বিশ্বব্যাংকের ১১টি প্রকল্প ঝুঁকির মুখে পড়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কূটনৈতিক অপরিপক্কতা ও অসহিষ্ণু মন্তব্য এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আর্থিক ও ব্যাংকিং খাত:
উচ্চ মূল্যস্ফীতি (১৬% পর্যন্ত), ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ৭১% হ্রাস পাওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুতর চাপের মুখে ছিল। অসম বানিজ্য চুক্তি ও বিদেশী বিনিয়োগ আনয়নে ব্যর্থতা আর্থিক খাতকে আরও অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে।
আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগ: মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস-এর মতে, ১৭ মাসে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব জাস্টিসের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা এবং আইনি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগও বিশ্লেষকরা তুলে ধরেছেন। ছিনতাই, হত্যা, চাদাবাজি, মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ যাকে এ সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে মনে করছে দেশের জনগন।
পরিশেষে বলা যায়, বিগত ১৭ মাসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা উজ্জীবিত করা অতিব জরুরী। দেশের সার্বিক উন্নয়ন, জনগনের নিরাপত্তা, অধিকারের প্রত্যাশায় সরকার কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখবে সেটাই মানুষ দেখতে চায়।
এস গোস্বামী - রাজনৈতিক বিশ্লেষক