২০২৬ সালের বাংলাদেশ কি ফিরছে অরওয়েলের ‘১৯৮৪’-এর অন্ধকারে?

স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা আজ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। রাজনৈতিক নীরবতা, আপোষ এবং স্বার্থপরতার কারণে ক্ষমতা এক নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সীমিত হয়ে যাচ্ছে। আজকের বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা নিজে নিজে টিকে থাকে না – এটি প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়।

PostImage

২০২৬ সালের বাংলাদেশ কি ফিরছে অরওয়েলের ‘১৯৮৪’-এর অন্ধকারে?


 1984  /  ১৯৮৪ / উনিশশো চুরাশি  

▪️জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস '১৯৮৪ -তে সতর্ক করা হয়েছিল : 

মানুষ কথা বলতে ভয় পেলে রাষ্ট্রের আর কষ্ট করে বলপ্রয়োগও করতে হয় না। মানুষকে চুপ করাতে পারলে রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জালিম হয়ে যায়। 

আদতে, স্বৈরতন্ত্র হঠাৎ করে আসে না,আসে নীরবতা , আপোষকামিতা আর ' চলুক না , আমার কী - জাতীয় রাজনৈতিক অনীহার (Political apathy) মানসিকতার ভেতর দিয়ে। স্বাধীনতা নিজে নিজে টিকে থাকে না। স্বাধীনতা এবং সত্যকে প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়।

অরওয়েল '১৯৮৪' - তে এলিট রিক্রুটমেন্ট থিওরির চরমতম রূপ দেখিয়েছেন। তিনি দেখান যে , একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ক্ষমতাকে সীমিত হাতে বেঁধে রাখতে চায় এবং সাধারণ মানুষকে রাজনীতির বাইরে রাখার চেষ্টা করে। বংশ বা অর্থ দিয়ে - রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা চর্চা জারি রাখতে চায়। 

এই ধরনের রাজনীতি নতুন বা ভিন্ন চিন্তার প্রবেশকে রুদ্ধ করে রাখে। নতুন কন্ঠ সহ্য করতে পারে না। সেখানে ক্ষমতা ঘুরে ফিরে একই গোষ্ঠীর হাতে থাকে,গণতন্ত্র নামেমাত্র। 

সেখানে দুর্নীতিবাজ নমস্য , দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামীকেই গোয়েবলসীয় কায়দায় বানানো হয় দুর্নীতিবাজ - সেখানে শিক্ষা ,স্বাস্থ্য , অর্থনীতি , প্রযুক্তি, আইন শৃঙ্খলার ইস্যুর চেয়ে জনগন বেশি ব্যস্ত থাকে ভন্ড পীর মৌলানার ধর্ম ব্যবসার খেলনা হিসেবে বুঁদ হয়ে ;  তুচ্ছ গায়ক আর তার তুচ্ছতর মেকওভার আর্টিস্ট স্ত্রীর বিচ্ছেদ নিয়ে গবেষণায়। সেখানে "শাউয়া মাউয়া" তত্ত্বের জনকরা আকস্মিক হিরো হয়ে উঠে - তাদের,আগের হিরো - হিরো আহমদের নিষ্প্রভ করে দিয়ে। এই নীচু আইকিউ সম্পন্ন জনতার দেউলিয়া চিন্তাই তাদের শোষন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র, ডিপস্টেট আর এর বাইরের দুর্বৃত্ত ননস্টেট এক্টরদের বিশাল সুবিধা এনে দেয়। 

'১৯৮৪' মূলত একটি সতর্কবার্তা। এই বইতে অরওয়েল আমাদের দেখান কীভাবে একটা রাষ্ট্র ধীরে ধীরে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত জীবন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। বিখ্যাত একটা লাইন আছে এই উপন্যাসে — 

"Big brother is watching you". 

অরওয়েলের বর্ণিত এই রাষ্ট্রযন্ত্র এবং রাজনীতি থেকেই আমরা মুক্ত হতে চাচ্ছিলাম। আগের সরকারের বিদায় পরবর্তী বাংলাদেশে -  জনগন, বিশেষত আলোকিত মধ্যবিত্ত  - যারা কিনা সবসময় সকল বিপ্লব আর ইতিবাচক পরিবর্তনে মূল ভূমিকা নেয় - তারা স্বচ্ছ,সৎ,মুক্ত মিডিয়া চেয়েছিলো,আইনের শাসন চেয়েছিলো, মেধাভিত্তিক দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চেয়েছিলো ,বাস্তববাদী স্বদেশপন্থী রাজনীতি চেয়েছিলো - কিন্তু সেটা আবার নিজেদের ব্যর্থতা আড়ালের জন্য সংকীর্ণ আর উগ্র জাতীয়তাবাদী ধোঁয়ার অসততা না ,জনমানুষের অধিকার নিশ্চিতের প্রক্রিয়া চেয়েছিলো। 

তাঁর তীব্র সমর্থকরাও প্রকাশ্যে না হোক,নিজেদের ঘরোয়া আলোচনায় স্বীকার করেন - বিবিধ কারণে পতিত সরকার প্রধান ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারিয়ে স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন , তবুও এও তো সত্য যে তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিকশিত হওয়াতে তাঁর মধ্যে ন্যুনতম দেশপ্রেম অবশিষ্ট ছিল - তাই তিনি অন্তত সেন্টমার্টিন দিতে রাজি ছিলেন না, বিরোধীদের শক্ত কিংবা নিষ্ঠুর হাতে দমন করেছেন সত্য  - কিন্তু আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন ঠিকঠাক পথে রেখেছিলেন।

কিন্তু আন্তর্জাতিক দালাল এক নীতিহীন "Lip service" এ পারঙ্গম সুদখোর এর নেতৃত্বে এদেশের বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন, চরম অসভ্য ,ভন্ড সিভিল সোসাইটি, এনজিও , বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আর ঘুষ ও ক্ষমতা থেকে দীর্ঘ উপবাসী এক আমলা গ্রুপ , পুলিশের একটি অংশ - যাদের এক বিরাট অংশ মূলত ডায়াস্পোরা ( বিদেশের স্থায়ী নাগরিক) - ফলে এদেশে তাদের কোনো স্টেক নেই , আনুগত্য ও মমতা নেই , তাদের সাথে বিভক্ত সেনাদলের আংশিক অপেশাদারিত্ব এবং সাথে আপাত ভদ্রতার ছদ্মবেশে লুকানো মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জঙ্গী গোষ্ঠী আর ছাত্র নামের "লুটপাটকারী ছাপড়ি মবতন্ত্র " আমাদের স্বপ্ন নির্দয়, নিষ্ঠুরভাবে চুরমার করেছে আর আমাদের ভবিষ্যত হয়তো প্রবেশ করতে যাচ্ছে পুরাতনের চেয়েও পুরাতন আদিমতম এক ঘোর অন্ধকারে৷ আমরা - ২০২৬ সাল থেকে ফিরে যাচ্ছি (জর্জ অরওয়েল এর) - ১৯৮৪ তে , যথারীতি এই ফেরাও হবে জনগন আর গণতন্ত্রের নামেই !

দুর্ভাগ্য আমাদের!! 


ফকরুল আনাম : লেখক ও গবেষক