বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ইইউর দৃঢ় সমর্থন
জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছবি সংবলিত একটি বিশেষ অ্যালবাম ইইউ নেতৃবৃন্দের হাতে তুলে দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও জনগণের আত্মত্যাগের গল্প আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই প্রতীকী উপহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংস্কার-আকাঙ্ক্ষা ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ইইউর দৃঢ় সমর্থন
ঢাকা, ৭ জানুয়ারি ২০২৬: ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বিত অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (Comprehensive Partnership and Cooperation Agreement—PCA) শিগগিরই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইউরোপীয় এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
ইউরোপীয় এক্সটারনাল অ্যাকশন সার্ভিস (EEAS)-এর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা পাম্পালোনি বুধবার ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ–ইইউ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল—সমন্বিত অংশীদারত্ব চুক্তির অগ্রগতি, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ, এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ।
পাওলা পাম্পালোনি জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে বিদ্যমান সাধারণ অংশীদারত্ব কাঠামোর পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে PCA নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। এই চুক্তি দুই পক্ষের সম্পর্ককে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক ইউনূসের গৃহীত “অসাধারণ ও ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম”-এর প্রশংসা করেন। পাম্পালোনি বলেন, আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে উচ্চাভিলাষী সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করেছে।
“এটি সত্যিই উল্লেখযোগ্য ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এটি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে,” বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, PCA চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
এর জবাবে অধ্যাপক ইউনূস গত ১৭ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারকে ইইউর অব্যাহত সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, PCA চুক্তি বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং এটি বাংলাদেশ–ইইউ সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও স্থিতিশীল করবে।
পাওলা পাম্পালোনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ইইউ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে—যার প্রতিফলন হিসেবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইইউ একটি উচ্চপর্যায়ের ও বৃহৎ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠাচ্ছে।
তিনি জানান, ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান চলতি সপ্তাহেই বাংলাদেশে পৌঁছাবেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই চার্টার অনুমোদন করেছে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে বলে তিনি আশাবাদী।
“আমি মনে করি না কোনো দল ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেবে,” বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা পুনর্ব্যক্ত করেন যে নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ। তিনি বলেন, “গত ১৬ বছর ধরে স্বৈরশাসনের অধীনে মানুষ প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেনি। এবার মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেবে।”
পাওলা পাম্পালোনি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সফল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পর বাংলাদেশ–ইইউ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে এবং বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুতফে সিদ্দিকী, এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ, এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার।