গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল: চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুম তদন্ত কমিশন
বাংলাদেশে সংঘটিত বলপূর্বক গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল সুপরিকল্পিত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সংগঠিত অপরাধ—এমন ভয়াবহ বাস্তবতা উঠে এসেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অফ ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে গুমের নির্দেশদাতা, ভুক্তভোগীদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং লাশ গুমের স্থান পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল: চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুম তদন্ত কমিশন
বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই কাজ করেছে—এমন চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অফ ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। রোববার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।
কমিশন জানায়, মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত।
কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, এখনো অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ নিয়ে সামনে আসছেন। তাঁর মতে, দেশে গুমের প্রকৃত সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘অনেক ভিক্টিম আমাদের সম্পর্কে জানেন না, কেউ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, আবার অনেকে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।’
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে গুম ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত অপরাধ (Politically Motivated Crime)। কমিশনের সদস্যরা জানান, গুমের শিকারদের বড় একটি অংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যারা গুমের শিকার হয়ে পরে জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অন্যদিকে, যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একাধিক হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে।
উল্লেখযোগ্য গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।
কমিশন সদস্যরা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেই বহু গুমের ঘটনায় সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। পাশাপাশি তদন্তে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ভারতে রেন্ডিশন করা হয়েছে—যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয়।