নির্বাচনী পরিবেশে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই—ইইউ প্রতিনিধিদলকে জাতীয় পার্টি
বৈঠকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ স্পষ্টভাবে জানান, সরকার অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন নেই।
নির্বাচনী পরিবেশে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই—ইইউ প্রতিনিধিদলকে জাতীয় পার্টি
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বৈঠকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচনের পরিবেশ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে জাতীয় পার্টি। বুধবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর গুলশান-২ এ ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্যালয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
■ জাতীয় পার্টির প্রতিনিধি দল:
বৈঠকে জাতীয় পার্টির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন—
মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মাসরুর মাওলা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন মিসেস বাইবা জারিনা এবং প্রথম সচিব (রাজনৈতিক) মিস্টার সেবাস্টিয়ান রিগার-ব্রাউন।
■ ‘নির্বাচনী পরিবেশ এখনও অংশগ্রহণমূলক নয়’ — আনিসুল ইসলাম মাহমুদ
বৈঠকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ স্পষ্টভাবে জানান, সরকার অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন নেই।
তিনি অভিযোগ করেন—প্রশাসন এখন দুই প্রধান রাজনৈতিক দলে বিভক্ত,
৫ আগস্টের পরবর্তী ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে জাতীয় পার্টির বহু নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে,
কিছু সিনিয়র নেতার বিরুদ্ধে আরোপিত বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার হয়নি।
তিনি আরও বলেন, “মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা না তুললে জাতীয় পার্টির পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়।”
■ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল বিষয়ে প্রশ্ন:
বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল বিষয়ে জাতীয় পার্টির মতামত জানতে চাইলে মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার জানান—
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পুনরাগমন স্বাগত;
তবে এর কার্যকারিতা শুরু হবে পরবর্তী (চতুর্দশ) সংসদ নির্বাচনে;
ফলে আসন্ন নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই হবে, যা নিয়ে জাতীয় পার্টির গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
হাওলাদার অভিযোগ করেন—সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টুপুসহ দলের বহু নেতাকে ‘মিথ্যা মামলায়’ বন্দি রাখা হয়েছে,
নির্বাচন মাত্র দেড়–দুই মাস দূরে, অথচ মামলা প্রত্যাহারের কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই,
জাতীয় পার্টি এখনো মাঠে প্রচারণায় যেতে পারছে না, অথচ সরকারসমর্থিত দলগুলো নির্বিঘ্নে প্রচার চালাচ্ছে।
তার ভাষায়, “এই পরিবেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন কতটা সম্ভব—তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সংশয় আছে।”বৈঠক শেষে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত মাসরুর মাওলা সাংবাদিকদের বলেন—
ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকটি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ইইউ জানতে চায়, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না।
উত্তরে দলীয় চেয়ারম্যান জানান—
জাতীয় পার্টি সবসময় নির্বাচনমুখী দল, কিন্তু বর্তমানে দেশে নির্বাচনোপযোগী পরিবেশ নেই।
মাওলা বলেন—দেশে ‘মব কালচার’ চলমান, জুলাই–আগস্টে দায়ের করা মিথ্যা মামলা বাতিল হয়নি,বিদেশযাত্রায় অযথা নিষেধাজ্ঞা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন,
এমনকি যাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করলেও জাতীয় পার্টিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
তার প্রশ্ন—“সরকার বা নির্বাচন কমিশন আদৌ চায় কি না জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিক—তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই বৈঠকে জাতীয় পার্টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নেই,মামলা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছাড়া নির্বাচনে অংশ সম্ভব নয়,তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আস্থার সংকট, নির্বাচন কমিশনের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ এখন এই অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর সমাধানের ওপর নির্ভর করছে।