কর্পোরেট কৃষির উত্থান—কৃষক কি বঞ্চিত হচ্ছে?

বাংলাদেশের কৃষিজমি রক্ষা, পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রসার এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ অ্যাগ্রোইকোলোজি প্ল্যাটফর্ম (বিএপি)-এর দিনব্যাপী জাতীয় কর্মশালা। দেশের নীতিনির্ধারক, কৃষি বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং তৃণমূলের কৃষক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজনটি কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।

PostImage

কর্পোরেট কৃষির উত্থান—কৃষক কি বঞ্চিত হচ্ছে?


বাংলাদেশ অ্যাগ্রোইকোলোজি প্ল্যাটফর্ম (বিএপি)-এর উদ্যোগে “কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার” শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা আজ রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের কৃষি, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও তৃণমূলের কৃষক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে কর্মশালা প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।


প্রথম অধিবেশনে কৃষি ব্যবস্থার সংকট ও করণীয় তুলে ধরেন বক্তারা


প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কারিতাস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক দাউদ জীবন দাশ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার। বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের।


মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি ও বিএপি-এর নির্বাহী সদস্য বদরুল আলম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন উবিনিগের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জনি। পুরো অধিবেশন পরিচালনা করেন পলিটিকাল এডুকেটর ও টিভি উপস্থাপিকা মেঘনা আলম।


প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরিদা আক্তার বলেন,

“শুধু বোরো ধানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; আউশ, আমন ও রবি শস্যকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”


তিনি আরও বলেন,হারবিসাইডের অতিরিক্ত ব্যবহারে পশুখাদ্যের সংকট তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়েছে।

কীটনাশকের ব্যবহার কৃষক, পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

সার ও কীটনাশকের প্রভাবে জলজ প্রাণীর বৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, অ্যাকোয়াকালচারের রাসায়নিক মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করছে।


দক্ষিণাঞ্চলে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাবে ইলিশ উৎপাদন কমেছে এবং হাওড় অঞ্চলে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণে মাছের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক খাদ্য ডাম্পিং ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনের ওপর আরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।

তিনি কৃষি-বহির্ভূত কর্পোরেট কৃষি ও ‘ফার্মলেস প্রোডাকশন’-এর প্রবণতাকে “উদ্বেগজনক” বলে উল্লেখ করেন।

তৃণমূলের কৃষক, শ্রমজীবী ও উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ


কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কৃষক, আদিবাসী, দলিত, হরিজন, চা শ্রমিক, জেলে ও রাখাইনসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন—

সুলেখা মং, শামছুন্নাহার ডলি খান, পাভেল পার্থ, জাকিয়া শিশির, নমিতা হালদার, সীমা দাস সীমু, আব্দুল খালেক, রুনা লায়লা, নাহিদুল হাসান নয়ন, অশিত, আন্সার আলী চান, মেহনাজ পারভিন মালা, শ্যমালী, আমিনুর রসুল, জাহানারা বেগম, খাদিজা বেগম, নুর কামরুন নাহার, রুবিনা অমলি কিসকু, সুনু রাণী দাস, আরজিনা খাতুন ও স্বপন এক্কা।

তারা কৃষিজমি দখল, বীজের অভাব, সার-কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ও খাদ্য উৎপাদনে কর্পোরেট প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ তুলে ধরেন।

দ্বিতীয় অধিবেশনে কৃষির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ আলোচনা

দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন উবিনিগের কনসালটেন্ট ড. এম এ সোবাহান। প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস. এম. সোহরাব উদ্দিন।

কৃষি সচিব তার বক্তব্যে বলেন,

“কৃষিক্ষেত্রে বহু আত্মহননমূলক কার্যকলাপ এখনও চলছে। কৃষিকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত জাতীয় পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন—জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি তৈরি হতে লাগে ১০০–১৫০ বছর, অথচ অব্যবস্থাপনার কারণে তা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।

ভূমি-সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নে সরকার ও জনগণ উভয়ের দায়িত্ব রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২৫ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনায় জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষকের হাতে বীজের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে; বীজ ব্যাংকের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা বরং কৃষকের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেয়।

এগ্রোইকোলজি ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় ধাপে ধাপে রূপান্তর এখন সময়ের দাবি।


সম্মাননা প্রদান ও সুপারিশ প্রেরণের ঘোষণা

কর্মশালার শেষে সভাপতি, প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের ক্রেস্ট প্রদান করেন বিএসডির নির্বাহী পরিচালক বনিফেস এস. গোমেজ এবং বেলার প্রোগ্রাম অফিসার ফিরোজুল ইসলাম মিলন।

বাংলাদেশ অ্যাগ্রোইকোলোজি প্ল্যাটফর্ম জানায়,

কৃষিজমি সুরক্ষা,ভূমি ব্যবস্থাপনা আইন বাস্তবায়ন,

পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা

এবং বীজের ওপর কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করা—

এসবই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কর্মশালায় পাওয়া সুপারিশসমূহ শিগগিরই নীতি-নির্ধারকদের কাছে প্রেরণ করা হবে বলেও জানানো হয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর