কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে উদ্বেগ, কঠোর নিয়ন্ত্রণ চান ভোটাররা

চাকরি হারানো, নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ ব্যয়ের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ভোটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় কঠোর সরকারি নজরদারি চান।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে উদ্বেগ, কঠোর নিয়ন্ত্রণ চান ভোটাররা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে উদ্বেগ, কঠোর নিয়ন্ত্রণ চান ভোটাররা


যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। নতুন এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, দেশটির অধিকাংশ ভোটার মনে করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবং কংগ্রেস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করছে না। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে চাকরি হারানো, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ, বিদ্যুতের ব্যবহার এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রযুক্তি চলে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রয়টার্স ও ইপসসের সাম্প্রতিক জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ হাজার ৫০৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৫২৬ জন নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন ট্রাম্প প্রশাসন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে না। কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অসন্তোষ দেখা গেছে। প্রায় ৫৪ শতাংশ ভোটার মনে করেন আইনপ্রণেতারাও এই ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করছেন না। 

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানুষের করা কিছু কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সক্ষম হচ্ছে। লেখালেখি, হিসাব, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা, সফটওয়্যার তৈরি এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে এর ব্যবহার বাড়ছে। ফলে উচ্চ বেতনের দাপ্তরিক চাকরিগুলো ভবিষ্যতে কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের বড় একটি অংশ মনে করছেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন যদি যথাযথ নিয়মকানুন ছাড়া এগিয়ে যায়, তাহলে এর সুবিধার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষতিও হতে পারে। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া ব্যবস্থা, ভুয়া তথ্য তৈরি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং সাইবার হামলার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনাকারী বিশাল তথ্যকেন্দ্র নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব কেন্দ্র পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। 

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে সব খবর নেতিবাচক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কিছু অংশে এই প্রযুক্তির কারণে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে। বড় তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নির্মাণসামগ্রী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামোর চাহিদা বেড়েছে। এর ফলে কিছু উৎপাদন খাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এখন আর শুধু প্রযুক্তি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংকিং, চিকিৎসা, পরিবহন, শিক্ষা, বিজ্ঞাপন, উৎপাদন, সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি সেবাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। ফলে এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু প্রযুক্তিবিদদের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; আইনপ্রণেতা, অর্থনীতিবিদ, শ্রম বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের দাবি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও প্রযুক্তির ওপর কিছু ধরনের সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের ৮০ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৬১ শতাংশ নতুন কঠোর নিয়মের পক্ষে মত দিয়েছেন। 

মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চলে যাওয়ার আশঙ্কাও কম নয়। জরিপে ৬২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কা তাঁদের রয়েছে। যদিও এটি একটি জনমত, বৈজ্ঞানিকভাবে ভবিষ্যতে ঠিক কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই এই সংখ্যাকে সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে মানুষের উদ্বেগের পরিমাপ হিসেবে দেখা উচিত, ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে নয়। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়েও মানুষের উদ্বেগ স্পষ্ট হয়েছে। জরিপে ৫৭ শতাংশ ভোটার সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিরোধিতা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের বদলে যন্ত্র যদি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করে, তাহলে ভুল সিদ্ধান্তের দায় কার ওপর বর্তাবে এই প্রশ্নই এখন প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিপুল বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উন্নত গণনাশক্তির অবকাঠামো গড়ে তুলছে। এর ফলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়লেও পরিবেশ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং স্থানীয় জনগণের ওপর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। 

নিউইয়র্ক ও সান ফ্রান্সিসকোর মতো বড় শহরেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দপ্তরের জায়গার চাহিদা বাড়ায় বাণিজ্যিক ভবনের বাজারে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। তবে এর বিপরীতে ভাড়া বাড়া এবং অন্যান্য ব্যবসার ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থনৈতিক সুফল সব মানুষের মধ্যে সমানভাবে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তির অগ্রগতি থামিয়ে না দিয়ে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও নতুন কর্মসংস্থানের সুবিধা পেতে পারে। একই সময়ে চাকরি হারানো, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, বিদ্যুতের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সামরিক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নিয়ম প্রয়োজন।

ফলে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের উদ্বেগ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, চাকরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায় এই প্রশ্নের উত্তরই এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় পরীক্ষা।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর