যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী ঝড়, শনিবার আঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে

উষ্ণ সাগরে দ্রুত শক্তি বাড়াচ্ছে ইসাইয়াস, উপকূলে জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও ভয়াবহ বাতাসের আশঙ্কায় প্রস্তুতি জোরদার।

যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী ঝড়, শনিবার আঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী ঝড়, শনিবার আঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে


যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে ক্রান্তীয় ঝড় ইসাইয়াস। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঝড়টি বৃহস্পতিবারের মধ্যেই ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে এবং শুক্রবার রাত থেকে শনিবারের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর উপসাগরীয় উপকূলে আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। ঝড়টির সম্ভাব্য গতিপথ ও শক্তি নিয়ে নিয়মিত পূর্বাভাস পরিবর্তন হতে পারে বলে উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় হারিকেন কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইসাইয়াস উষ্ণ উপসাগরীয় জলরাশির ওপর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। বুধবার বিকেলে ঝড়টির সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১০৫ কিলোমিটার ছিল। একই সময়ে এর কেন্দ্র ছিল মেক্সিকোর পূর্বাঞ্চল থেকে অনেক দূরে এবং মিসিসিপি নদীর মোহনা থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ঝড়টি উত্তর-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলের দিকে অগ্রসর হতে পারে। 

ইসাইয়াসকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস, প্রবল বাতাস এবং ভারী বৃষ্টিপাত। জাতীয় হারিকেন কেন্দ্র জানিয়েছে, লুইজিয়ানা থেকে ফ্লোরিডা পর্যন্ত উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ঝড়ের প্রভাবে আকস্মিক বন্যা ও নদীর পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কয়েক ইঞ্চি ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং স্থানীয়ভাবে আরও বেশি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। উপকূলের নিচু এলাকায় সামুদ্রিক পানি ঢুকে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। 

ফ্লোরিডা ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বহু এলাকায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। আলাবামার কর্তৃপক্ষও ঝড়ের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করেছে। কিছু উপকূলীয় এলাকায় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি সেবা সংস্থাগুলো উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখছে এবং ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথে থাকা এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত করা হচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ঝড়ের দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি। উপসাগরের পানির তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় ঝড়টি শক্তি সঞ্চয় করার অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে। তবে স্থলভাগের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগে ওপরের বায়ুমণ্ডলের প্রবল বাতাস ঝড়টির শক্তি কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে শেষ মুহূর্তে ঝড়টি কতটা শক্তিশালী থাকবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝড়টির সম্ভাব্য আঘাতের এলাকা হিসেবে মিসিসিপি, আলাবামা এবং ফ্লোরিডার উপকূলীয় অঞ্চলকে বিশেষভাবে নজরে রাখা হচ্ছে। তবে ঝড়ের গতিপথ সামান্য পরিবর্তন হলেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিধি বড় হতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের শুধু সরাসরি আঘাতের সম্ভাব্য এলাকার দিকে না তাকিয়ে স্থানীয় জরুরি নির্দেশনাও অনুসরণ করতে বলেছে। 

ঝড়টি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতেও বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক তেল ও গ্যাস স্থাপনা রয়েছে। ঝড়ের প্রস্তুতি হিসেবে কয়েকটি বড় জ্বালানি কোম্পানি তাদের সমুদ্রভিত্তিক কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে এবং কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, শেল ও শেভরনসহ বড় কোম্পানিগুলো কয়েকটি স্থাপনায় উৎপাদন বন্ধ বা কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। 

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝড়ের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন ও পরিবহন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে জ্বালানির দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ঝড়ের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও উৎপাদন ঘাটতি কতটা হবে, তা আঘাতের পরই স্পষ্ট হবে। 

ঝড়টির কারণে শুধু আবহাওয়া নয়, পরিবহন ব্যবস্থাতেও বিঘ্ন ঘটতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় বিমান চলাচল, নৌযান, সড়ক যোগাযোগ এবং বন্দর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে। ভারী বৃষ্টির কারণে অভ্যন্তরীণ এলাকায় আকস্মিক বন্যা হলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ইসাইয়াস চলতি মৌসুমের প্রথম আটলান্টিক ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলে সেটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হবে। চলতি বছর আটলান্টিক অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে ওপরের বায়ুমণ্ডলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের উষ্ণ পানি এবং অনুকূল বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি ইসাইয়াসকে দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রস্তুতি। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের জরুরি নথি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার, পানীয় জল, টর্চ, ব্যাটারি ও যোগাযোগের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। যেসব এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে, সেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ঝড়টির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর উপসাগরীয় উপকূলে। তবে ঝড়টি স্থলভাগ অতিক্রম করার পরও বিপদ শেষ হবে না। ভারী বৃষ্টি ও বন্যার কারণে ঝুঁকি পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ইসাইয়াসকে শুধু উপকূলীয় ঝড় হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য বিস্তৃত দুর্যোগ হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। 



সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর