যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পরীক্ষাগার বন্ধে নতুন উদ্যোগ, ইলেকট্রনিক পণ্যে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পরীক্ষাগারে ইলেকট্রনিক পণ্য পরীক্ষা বন্ধের উদ্যোগ, জাতীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সমতার যুক্তিতে বিধি আনছে কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পরীক্ষাগার বন্ধে নতুন উদ্যোগ, ইলেকট্রনিক পণ্যে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পরীক্ষাগার বন্ধে নতুন উদ্যোগ, ইলেকট্রনিক পণ্যে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা


যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল যোগাযোগ কমিশন চীনে অবস্থিত পরীক্ষাগারগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য তৈরি ইলেকট্রনিক পণ্যের পরীক্ষা ও অনুমোদন কার্যক্রম বন্ধ করার দিকে এগোচ্ছে। স্মার্টফোন, ক্যামেরা, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও যোগাযোগ-সংশ্লিষ্ট পণ্যের নিরাপত্তা ও মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে চীনা পরীক্ষাগারের ওপর নির্ভরতা কমানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। কমিশন জানিয়েছে, আগামী ২৯ অক্টোবর প্রস্তাবটি নিয়ে ভোট হবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে নতুন বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। 

প্রস্তাবটির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশটির কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিদেশি সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবাধীন পরীক্ষাগার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশকারী প্রযুক্তিপণ্যের পরীক্ষা করলে সেই প্রক্রিয়ার ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে যেসব পণ্যে যোগাযোগ প্রযুক্তি, বেতার ব্যবস্থা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি উপাদান রয়েছে, সেগুলোর পরীক্ষা ও অনুমোদন ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখার ওপর জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন। 

ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য নির্ধারিত ইলেকট্রনিক পণ্যের প্রায় ৮২ শতাংশ চীনে পরীক্ষা করা হয়েছিল। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল মোট ইলেকট্রনিক পণ্যের ৪ শতাংশেরও কম। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশকারী প্রযুক্তিপণ্যের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে চীনের পরীক্ষাগারগুলোর ওপর নির্ভরতা কতটা বেশি।

নতুন প্রস্তাবটি শুধু চীনা সরকারের মালিকানাধীন পরীক্ষাগারকে লক্ষ্য করছে না। বরং এমন দেশগুলোর পরীক্ষাগার ও অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানকেও বিধিনিষেধের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারকে একই ধরনের পারস্পরিক সুযোগ দেয় না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শুধু চীনবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং পরীক্ষাগার ও অনুমোদন ব্যবস্থায় পারস্পরিক সমতার নীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে। 

তবে বিষয়টি হঠাৎ শুরু হয়নি। ২০২৫ সালেই ফেডারেল যোগাযোগ কমিশন বিদেশি প্রতিপক্ষ দেশের সরকারের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারের স্বীকৃতি বাতিলের জন্য নতুন নিয়ম গ্রহণ করেছিল। এরপর চীনা সরকারের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন বেশ কয়েকটি পরীক্ষাগারের স্বীকৃতি প্রত্যাহার, নবায়ন না করা কিংবা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। কমিশনের নথিতে এমন ২৩টি পরীক্ষাগারের কথা উল্লেখ রয়েছে, যেগুলো বিদেশি প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত হওয়ার পর আর স্বীকৃত পরীক্ষাগার হিসেবে রাখা হয়নি। 

ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের ২০২৫ সালের ঘোষণাতেও বলা হয়েছিল, বিদেশি প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের সরকার যেন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবহৃত প্রযুক্তিপণ্য পরীক্ষাকারী পরীক্ষাগারগুলোর মালিক বা নিয়ন্ত্রক না হয়। তখন কমিশন জানিয়েছিল, এসব পরীক্ষাগারের ওপর আস্থা ও অনুমোদন ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। নতুন উদ্যোগটি সেই আগের নীতিকে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। 

প্রস্তাবিত বিধিনিষেধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কার্যকর হওয়ার সময়। এখনই চীনের সব পরীক্ষাগার থেকে পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। কমিশনের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞাগুলো ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প পরীক্ষাগার ও অনুমোদন ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের সরবরাহ ও উৎপাদন পরিকল্পনা সামঞ্জস্য করার জন্য সময় দেওয়া হবে। 

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত দেশগুলোর পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা পণ্যের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে চীনা পরীক্ষাগারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে, অন্যদিকে বিকল্প পরীক্ষাগার ব্যবস্থাকে দ্রুত কার্যকর করার চেষ্টা করছে। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতাদের পরীক্ষার স্থান পরিবর্তন করতে হতে পারে। 

এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা ও অন্যান্য যোগাযোগনির্ভর পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের আগে নির্দিষ্ট মান ও প্রযুক্তিগত বিধি মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করতে হয়। পরীক্ষার বড় একটি অংশ যদি চীনের বাইরে সরিয়ে নিতে হয়, তাহলে উৎপাদকদের অতিরিক্ত সময় ও খরচের মুখোমুখি হতে হতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চীনের পরীক্ষাগার ব্যবহার করছে, তাদের জন্য সরবরাহব্যবস্থা পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতারও অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কিছু চীনা যোগাযোগ সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিপণ্যের বাজার প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। নতুন পরীক্ষাগার নীতিও সেই বৃহত্তর প্রযুক্তি নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

তবে এটিকে এখনই সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ২৯ অক্টোবর কমিশনের ভোটের আগে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হয়নি। ভোটের পরও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের প্রস্তুতি থাকবে। ফলে বর্তমানে সবচেয়ে সঠিক তথ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র চীনা পরীক্ষাগারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং চীনে অবস্থিত পরীক্ষাগারগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের পণ্যের পরীক্ষা সীমিত করতে নতুন বিধি এগিয়ে নিচ্ছে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর