যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজনের নতুন কর্মী ছাঁটাই, খুচরা ব্যবসায় এক হাজারের কম চাকরি কমল

যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজনের নতুন কর্মী ছাঁটাইয়ে এক হাজারের কম চাকরি কমেছে, খুচরা ব্যবসার পুনর্গঠন নিয়ে কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজনের নতুন কর্মী ছাঁটাই, খুচরা ব্যবসায় এক হাজারের কম চাকরি কমল

যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজনের নতুন কর্মী ছাঁটাই, খুচরা ব্যবসায় এক হাজারের কম চাকরি কমল


যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ প্রযুক্তি ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন নতুন করে কর্মী ছাঁটাই করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এবার মূলত তাদের অনলাইন দোকান পরিচালনাকারী বিভাগে কর্মীসংখ্যা কমানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এবার এক হাজারের কম সাদা-কলারের কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভারত ও যুক্তরাজ্যেও কিছু কর্মী এই ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়েছেন। 

নতুন ছাঁটাইয়ের খবরটি এমন সময়ে এসেছে, যখন অ্যামাজনের অন্যতম বড় কেনাকাটার আয়োজন চলছে। মঙ্গলবার শুরু হওয়া দুই দিনের বিশেষ মূল্যছাড়ের আয়োজন বুধবার শেষ হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের মধ্যে নতুন করে চাকরি হারানোর খবর আলোচনায় এসেছে। তবে অ্যামাজন বলেছে, এটি পুরো প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ছাঁটাই নয়; বরং ব্যবসার নির্দিষ্ট অংশের কাঠামো পরিবর্তনের অংশ হিসেবে সীমিতসংখ্যক পদ বাতিল করা হয়েছে। 

অ্যামাজনের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, গ্রাহকদের অগ্রাধিকার ও প্রতিষ্ঠানের বর্তমান লক্ষ্য আরও ভালোভাবে বাস্তবায়নের জন্য অনলাইন দোকান বিভাগের কিছু কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে। এর ফলে কয়েকটি পদ বিলুপ্ত করার কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের পরিবর্তনের সময় সহায়তা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিমাণ নিয়ে অ্যামাজন নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, এক হাজারের কম সাদা-কলারের কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। কর্মীদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, গ্রাহকসেবা, বিক্রেতা সহায়তা এবং অনলাইন বাজার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি দলেও পরিবর্তন এসেছে। তবে কোন বিভাগে কতজন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিস্তারিত সংখ্যা দেয়নি।

নতুন ছাঁটাইকে অ্যামাজনের সাম্প্রতিক কর্মী পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি গত বছর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার করপোরেট পদ কমিয়েছিল। ওই বড় ছাঁটাইয়ের পরও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন বিভাগে ছোট পরিসরে কর্মীসংখ্যা সমন্বয় করে আসছে। জানুয়ারিতে অ্যামাজন ১৬ হাজার করপোরেট পদ কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল, যা আগের ছাঁটাইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজারে পৌঁছায়। 

অ্যামাজনের এই কর্মী পুনর্গঠনের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছরে দ্রুত সম্প্রসারণ করেছে। মহামারির সময় ঘরে বসে কেনাকাটা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনলাইন ব্যবসার চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেই সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ করে। পরে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও দোকানভিত্তিক কেনাকাটা বাড়ার সঙ্গে অনলাইন কেনাকাটার প্রবৃদ্ধির ধরন পরিবর্তিত হয়। ফলে অ্যামাজন বিভিন্ন বিভাগে কর্মীসংখ্যা ও ব্যয় নতুন করে পর্যালোচনা করছে।

অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান জেফ বেজোসও সম্প্রতি কর্মীসংখ্যা কমানোর প্রসঙ্গে মহামারির সময় অতিরিক্ত নিয়োগের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় ঘরে থাকা মানুষ ব্যাপকভাবে অনলাইনে পণ্য কিনছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কর্মীসংখ্যা বাড়াতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যবসার বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় কর্মী কাঠামোও পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছে। 

তবে অ্যামাজনের কর্মী ছাঁটাইকে শুধু অর্থনৈতিক দুর্বলতার ফল হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ হবে। বর্তমানে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং তথ্যকেন্দ্রিক অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ করছে। এসব প্রযুক্তি কিছু কাজ দ্রুত ও কম কর্মী দিয়ে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান পুরোনো কর্মী কাঠামো কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কার্যক্রমে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। 

অ্যামাজনের ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এবারের এক হাজারের কম চাকরি কমানোর সিদ্ধান্তকে সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে হয়েছে—এমন দাবি অ্যামাজন করেনি। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী, মূল কারণ হলো ব্যবসার কাঠামো পরিবর্তন এবং বর্তমান অগ্রাধিকারের সঙ্গে বিভাগগুলোকে আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্য করা। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরাসরি এক হাজার কর্মীর চাকরি নিয়ে নিয়েছে’ এমন সরল দাবি তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না।

কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রভাব শুধু চাকরি হারানো ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মীসংখ্যা কমলে স্থানীয় অর্থনীতি, ভাড়া, ভোক্তা ব্যয় এবং প্রযুক্তি খাতের চাকরির বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে উচ্চ বেতনের করপোরেট কর্মীদের চাকরি কমলে সংশ্লিষ্ট শহরগুলোর আবাসন ও ভোগব্যয়ের ওপরও কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে অ্যামাজনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনকে বিনিয়োগকারীরা ভিন্নভাবে দেখেন। কর্মী ও প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে ব্যবসা আরও কার্যকর করার চেষ্টা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়াতে পারে। কিন্তু একই সময়ে অতিরিক্ত কর্মী ছাঁটাই করলে নতুন পণ্য উন্নয়ন, গ্রাহকসেবা এবং কর্মীদের মনোবলের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

এই ছাঁটাইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মীদের অনিশ্চয়তা। এর আগে বড় পরিসরে কর্মী ছাঁটাইয়ের পর অ্যামাজনের করপোরেট কর্মীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ চাকরি নিয়ে উদ্বেগ ছিল। এবার নতুন করে কিছু কর্মী চাকরি হারানোয় সেই উদ্বেগ আবার সামনে এসেছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগমাধ্যমে কর্মীরা চাকরি শেষ হওয়ার সময়সীমা, ক্ষতিপূরণ এবং প্রতিষ্ঠানের অন্য বিভাগে নতুন চাকরির সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে প্রতিবেদন এসেছে। 

তবে অ্যামাজনের মোট কর্মীসংখ্যার তুলনায় এবারের ছাঁটাই খুবই ছোট অংশ। প্রতিষ্ঠানটিতে বিপুলসংখ্যক কর্মী রয়েছে এবং বেশিরভাগ কর্মী সরবরাহ ও গুদাম ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। নতুন ছাঁটাই মূলত করপোরেট পর্যায়ের এবং বিশেষ করে অনলাইন দোকান পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগে হয়েছে। তাই এটিকে পুরো অ্যামাজনের ব্যাপক কর্মী সংকোচন হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।

তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, অ্যামাজন সত্যিই নতুন করে কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং এক হাজারের কম সাদা-কলারের কর্মী এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও যুক্তরাজ্যের কর্মীরাও এর মধ্যে রয়েছেন। তবে সঠিক সংখ্যা, বিভাগভিত্তিক হিসাব এবং প্রত্যেক দেশের কতজন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন এসব তথ্য অ্যামাজন প্রকাশ করেনি। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। 

নতুন কর্মী ছাঁটাই অ্যামাজনের চলমান ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের আরেকটি ধাপ। প্রতিষ্ঠানটি একদিকে কর্মী ও সাংগঠনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ ব্যবসার দিকে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে কিছু কর্মীর চাকরি হারালেও অ্যামাজনের সামগ্রিক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে এমন কোনো তথ্য বর্তমানে পাওয়া যায়নি। বরং প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমের দিকে কর্মী ও সম্পদ পুনর্বিন্যাস করছে। তাই খবরটির সবচেয়ে নির্ভুল সারাংশ হলো যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে অ্যামাজন এক হাজারের কম করপোরেট কর্মীর নতুন ছাঁটাই করেছে, যা বৃহত্তর সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর