নতুন বছরে অবৈধ মোবাইল বন্ধ, জানুয়ারিতে আবার চালু হচ্ছে এনইআইআর ব্যবস্থা বাংলাদেশে

২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অবৈধ ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা মোবাইল শনাক্ত করে বন্ধ করবে বিটিআরসির নতুন এনইআইআর ব্যবস্থা দেশজুড়ে।

নতুন বছরে অবৈধ মোবাইল বন্ধ, জানুয়ারিতে আবার চালু হচ্ছে এনইআইআর ব্যবস্থা বাংলাদেশে

নতুন বছরে অবৈধ মোবাইল বন্ধ, জানুয়ারিতে আবার চালু হচ্ছে এনইআইআর ব্যবস্থা বাংলাদেশে


বাংলাদেশে অবৈধ ও চোরাই মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধ করতে নতুন করে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন। আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন করে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এবার ব্যবস্থাটিতে অবৈধভাবে দেশে আনা বা তৈরি করা মোবাইল শনাক্ত করে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুবিধা থাকবে।

বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর কমিশন এনইআইআর পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। হ্যান্ডসেট শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য এটি বিটিআরসির তৃতীয় উদ্যোগ।


এনইআইআর মূলত সরকারের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার। মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা যায়। মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে এই তথ্যভান্ডারের সংযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষ জানতে পারে কোনো ফোন অনুমোদিতভাবে দেশে এসেছে কি না এবং সেটি বৈধভাবে নিবন্ধিত হয়েছে কি না।

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি চালুর পর দেশে আনা অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে সেগুলো মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ থাকবে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ফোনের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ফলে বিদেশ থেকে অনানুষ্ঠানিক পথে আনা অনেক ফোনের বাজারে বিক্রি ও ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়তে পারে।


তবে বর্তমানে ব্যবহার করা সব ফোন হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া হবে না। বিটিআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কে বর্তমানে সক্রিয় থাকা হ্যান্ডসেটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনইআইআরে নিবন্ধিত হবে। অর্থাৎ আগে থেকেই নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা ফোনগুলোকে ব্যবস্থার আওতায় আনার ক্ষেত্রে আলাদা প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে।


আমদানিকারকদের জন্যও একটি সুযোগ রাখা হচ্ছে। যেসব ফোন আগে আমদানি করা হয়েছে কিন্তু এখনো বিক্রি হয়নি, অথবা যেসব ফোন গুদামে মজুত রয়েছে, সেগুলোর আইএমইআই নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য এনইআইআরে জমা দেওয়া যাবে। এর ফলে বৈধ আমদানিকারকের হাতে থাকা ফোনগুলোকে নতুন ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ থাকবে।


এনইআইআর দুই ধাপে চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপ শুরু হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি। এই ধাপে মূল ব্যবস্থার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা থাকবে। তবে ডি-রেজিস্ট্রেশন সুবিধা প্রথম পর্যায়ে চালু হবে না।

ডি-রেজিস্ট্রেশন সুবিধা চালু হলে একটি নিবন্ধিত মোবাইল ফোনের মালিকানা একজন ব্যবহারকারীর কাছ থেকে অন্য ব্যবহারকারীর কাছে পরিবর্তনের তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে। অর্থাৎ একটি ফোন বিক্রি বা মালিকানা পরিবর্তন হলে নতুন মালিকের তথ্য ব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। তবে এই সুবিধা চালুর জন্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এখনো দ্বিতীয় ধাপের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।


তবে নতুন ব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিটিআরসির সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ক্লোন করা হ্যান্ডসেট বন্ধ করার সুবিধা থাকবে না। একই আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে তৈরি করা নকল বা ক্লোন ফোন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। এসব ফোন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ফলে এনইআইআরের প্রথম ধাপ চালুর পরও ক্লোন ফোন নিয়ে সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না।


বাংলাদেশে এনইআইআর ব্যবস্থা প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছিল ২০২১ সালে। কিন্তু তখন এটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা কার্যকর না থাকায় ব্যবস্থাটির মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়।

এরপর বিভিন্ন সময় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এনইআইআর পুরোপুরি চালুর উদ্যোগ নেয়। ২০২৪ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থাটি পুরোপুরি চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল। সেখানে অবৈধ মোবাইল আমদানির কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।


২০২৫ সালেও এনইআইআর পুরোপুরি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক মোবাইল ফোন বিক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রতিবাদের কারণে বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের পর বিটিআরসি গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুবিধা ছাড়া ব্যবস্থা চালুর পথে যায়। এবার আবার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, এনইআইআর চালুর পেছনে শুধু রাজস্ব আদায়ের বিষয় নয়, জননিরাপত্তার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল ফোন বর্তমানে ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যাংকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আর্থিক লেনদেন ও বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি ফোনের পরিচয় নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


অবৈধ ফোনের বাজার নিয়ন্ত্রণ হলে বৈধ আমদানিকারকেরাও সুবিধা পেতে পারেন। বর্তমানে বৈধভাবে আমদানি করা ফোনের সঙ্গে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ফোনের দামের পার্থক্য তৈরি হয়। অবৈধ ফোন অনেক সময় কম দামে বিক্রি হওয়ায় বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় চাপের মুখে পড়েন। এনইআইআর কার্যকর হলে এই বাজারে কিছুটা শৃঙ্খলা আসতে পারে।

অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ফোন কেনার সময় সতর্ক থাকা। নতুন ব্যবস্থায় অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা গেলে ক্রেতারাও সমস্যায় পড়তে পারেন, বিশেষ করে কেউ যদি অজান্তে অননুমোদিত ফোন কিনে ফেলেন। তাই অনুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে ফোন কেনা এবং ক্রয়ের কাগজপত্র সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিটিআরসি জানিয়েছে, এনইআইআর সম্পর্কে জনগণকে জানাতে প্রচার চালানো প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষের হাতে ১ জানুয়ারি ২০২৭-এর আগে কয়েক মাস সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ভোক্তা, আমদানিকারক, বিক্রেতা এবং মোবাইল ব্যবহারকারীদের নতুন ব্যবস্থার নিয়ম জানানো হবে।


সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের মোবাইল ফোন বাজারে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে এরপর দেশে আনা অবৈধ ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া ফোন শনাক্ত করে বন্ধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বর্তমানে সক্রিয় ফোনগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।


তবে এনইআইআর কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, ভোক্তাদের সচেতনতা এবং অবৈধ আমদানি নিয়ন্ত্রণের ওপর। বিশেষ করে ক্লোন ফোন বন্ধের সুবিধা প্রথম ধাপে না থাকায় ব্যবস্থাটির কিছু সীমাবদ্ধতা থেকেই যাচ্ছে। তারপরও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর হলে বাংলাদেশের মোবাইল ফোন বাজার, রাজস্ব ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তায় এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর