নিউইয়র্কে শিশুদের ভর্তুকির অপেক্ষা কাটছে, ১০ হাজার পরিবার পাচ্ছে নতুন আশার আলো
মামদানির ঘোষণায় নিউইয়র্কে দশ হাজারের বেশি শিশু ভর্তুকি পাবে, তবে প্রায় ঊনত্রিশ হাজার শিশু এখনো সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে
নিউইয়র্কে শিশুদের ভর্তুকির অপেক্ষা কাটছে, ১০ হাজার পরিবার পাচ্ছে নতুন আশার আলো
নিউইয়র্ক শহরে শিশুদের দেখাশোনার খরচ কমাতে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে অপেক্ষমাণ শিশুদের তালিকা থেকে এবার ধাপে ধাপে ১০ হাজারের বেশি শিশুকে বের করে আনার ঘোষণা দিয়েছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। এর ফলে নিম্ন আয়ের বহু পরিবার তাদের সন্তানদের জন্য বিনা খরচে বা অত্যন্ত কম খরচে শিশু পরিচর্যার সুযোগ পাওয়ার পথ খুলে পাবে। তবে এই উদ্যোগের পরও প্রায় ২৯ হাজার শিশু সহায়তার অপেক্ষায় থাকবে।
নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা পরিবারগুলোর সঙ্গে ধাপে ধাপে যোগাযোগ শুরু করা হবে। যেসব পরিবারকে আবেদন করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে, তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য আবার জমা দিতে হবে। যোগ্যতা যাচাইয়ের পর সন্তানদের জন্য শিশু পরিচর্যা ভর্তুকি দেওয়া হবে। পরিবারগুলো নিজেদের পছন্দের অনুমোদিত শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একসঙ্গে সব অপেক্ষমাণ শিশুকে সুবিধা দিচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে পরিবারগুলোকে সুযোগ দেওয়া হবে। যেসব পরিবার গৃহহীন, যাদের সন্তানের বিশেষ চাহিদা রয়েছে অথবা যাদের পারিবারিক আয় নির্ধারিত সীমার নিচে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত আয়ের সীমা ফেডারেল দারিদ্র্যসীমার ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত হলে সংশ্লিষ্ট পরিবার অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য হতে পারে।
এই ভর্তুকি কর্মসূচি খুব ছোট শিশু থেকে শুরু করে ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের সহায়তা করে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ১৯ বছর পর্যন্ত হতে পারে। ফলে শুধু শিশুদের পরিচর্যার খরচ কমানো নয়, কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য কাজ ধরে রাখার সুযোগও তৈরি হয়। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে শিশু পরিচর্যার খরচ এত বেশি যে একজন অভিভাবককে কাজ ছেড়ে দিতে বা কম সময় কাজ করতে হয়। ভর্তুকি পাওয়া গেলে সেই চাপ অনেকটাই কমতে পারে।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবেই ১০ হাজারের বেশি শিশুকে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে বের করে আনার ঘোষণা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় বলা হয়েছে, তালিকায় থাকা পরিবারগুলোকে আগামী কয়েক মাসে পর্যায়ক্রমে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হবে। তাই ১০ হাজারের বেশি শিশুকে সুবিধার আওতায় আনার দাবিটি সঠিক।
প্রায় ২৯ হাজার শিশু এখনো অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে এই তথ্যটিও সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। নগর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় ২৯ হাজার নিম্ন আয়ের শিশু শিশু পরিচর্যা সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে নতুন ঘোষণাকে বড় অগ্রগতি বলা গেলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান এখনো হয়নি।
অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরির পেছনে অর্থের ঘাটতিই ছিল বড় কারণ। ২০২৫ সালের ৫ মে থেকে নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় নগদ সহায়তা না পাওয়া পরিবারগুলোর জন্য নতুন শিশু পরিচর্যা ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ওই সময়ের পর যোগ্য পরিবার আবেদন করতে পারলেও তাদের সন্তানদের অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হচ্ছিল। বর্তমানে সেই সিদ্ধান্তের ফলে তৈরি হওয়া দীর্ঘ তালিকা কমানোর চেষ্টা চলছে।
২০২৫ সালের মে মাসে এই সংকট প্রকাশ্যে আসার পর নিউইয়র্কে পরিবার, শিশু পরিচর্যা প্রদানকারী এবং বিভিন্ন সংগঠন দ্রুত অর্থ বরাদ্দের দাবি জানায়। নগর পরিষদের আলোচনাতেও শিশু পরিচর্যা ভর্তুকির অর্থের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালের নগর বাজেটে রাজ্য থেকে পাওয়া অর্থের সঙ্গে মিলিয়ে শিশু পরিচর্যা ভর্তুকি ধরে রাখার জন্য শত শত কোটি ডলারের ব্যবস্থা করা হয়।
২০২৬ সালে এই সংকট মোকাবিলায় নিউইয়র্কের রাজ্য সরকারও বড় অর্থ দেওয়ার ঘোষণা করেছে। রাজ্য গভর্নর ক্যাথি হকুলের পক্ষ থেকে নিউইয়র্ক শহরের বিনা খরচের শিশু পরিচর্যা উদ্যোগে মোট ১২০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার সরাসরি শিশু পরিচর্যা ভর্তুকি কর্মসূচিতে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। এই অর্থই অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে হাজার হাজার শিশুকে সহায়তার আওতায় আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া মামদানি প্রশাসন ভর্তুকি পাওয়া পরিবারগুলোর ওপর থাকা অতিরিক্ত নিজস্ব খরচ কমাতেও অর্থ বরাদ্দ করেছে। নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৫২ লাখ ডলারের একটি আলাদা বিনিয়োগের মাধ্যমে ভর্তুকি পাওয়া পরিবারগুলোর নিজস্ব পকেট থেকে দেওয়া খরচ দূর করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, যেসব পরিবার ভর্তুকির জন্য যোগ্য হবে, তাদের শিশু পরিচর্যার আর্থিক চাপ আরও কমতে পারে।
মামদানি বলেছেন, শিশু পরিচর্যার ভর্তুকি অনেক পরিবারের জন্য শুধু একটি আর্থিক সুবিধা নয়, বরং কর্মজীবন ও পারিবারিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সহায়তা। একটি পরিবারের বাবা-মা কাজ করতে গেলে সন্তানের নিরাপদ পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এই ব্যবস্থা না থাকলে অনেক অভিভাবক চাকরি, পড়াশোনা কিংবা অন্য আয়ের সুযোগ থেকে পিছিয়ে যেতে পারেন।
শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোর জন্যও অপেক্ষমাণ তালিকা একটি বড় সমস্যা তৈরি করেছে। যেসব কেন্দ্র ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল পরিবারকে সেবা দেয়, তাদের অনেক আসন দীর্ঘদিন খালি থাকতে পারে। কারণ পরিবারগুলোর ভর্তুকি না থাকলে তারা শিশু পরিচর্যার খরচ বহন করতে পারে না। ফলে একদিকে পরিবার সমস্যায় পড়ে, অন্যদিকে ছোট শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোও আর্থিক সংকটে পড়ে। নতুন করে হাজার হাজার শিশুকে ভর্তুকির আওতায় আনার ফলে এসব কেন্দ্রেও নতুন শিশু ভর্তি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
নগর কর্তৃপক্ষ শিশু পরিচর্যা খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় পরিবারগুলো অনলাইনে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের তথ্য দেখতে পারবে এবং কোন কেন্দ্র ভর্তুকি গ্রহণ করে তা যাচাই করতে পারবে। আগে অনেক পরিবারকে একের পর এক কেন্দ্রে ফোন করে তথ্য জানতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় একই জায়গায় এই তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার। অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা প্রত্যেক পরিবার এখনই ভর্তুকি পাবে না। নগর কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমে পরিবারগুলোকে আমন্ত্রণ জানাবে এবং যোগ্যতা যাচাইয়ের পর সুবিধা দেওয়া হবে। কোনো পরিবারকে এখনো আমন্ত্রণ জানানো না হলে নতুন করে আবেদন না করার জন্যও নগর কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে। আমন্ত্রণ পাওয়ার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তথ্য জমা দিতে হবে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, মামদানি প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ নিউইয়র্কের শিশু পরিচর্যা সংকটে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি আনতে পারে। ১৫ মাস ধরে নতুন পরিবারকে কার্যত অপেক্ষা করতে হওয়ার পর ১০ হাজারের বেশি শিশুকে তালিকা থেকে বের করে আনার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বড় অগ্রগতি। কিন্তু প্রায় ২৯ হাজার শিশু এখনো অপেক্ষায় থাকায় সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি। সামনে নিয়মিত অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং অপেক্ষমাণ সব যোগ্য শিশুকে পর্যায়ক্রমে সহায়তার আওতায় আনা হবে কি না, সেটিই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।