চাকরির বাজারে গতি কমেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে বাড়ছে অর্থনীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব কম থাকলেও নতুন চাকরি তৈরির গতি ধীর হয়েছে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনীতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে।
চাকরির বাজারে গতি কমেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে বাড়ছে অর্থনীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বেকারত্বের হার ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম থাকলেও নতুন চাকরি তৈরির গতি আগের তুলনায় অনেক ধীর হয়ে গেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনীতি নিয়ে এমন পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।
সেপ্টেম্বরের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। সংখ্যাটি ঐতিহাসিকভাবে কম এবং অর্থনীতিবিদদের প্রচলিত হিসাবে পূর্ণ কর্মসংস্থানের কাছাকাছি। কিন্তু শুধু বেকারত্বের হার দেখলে বর্তমান শ্রমবাজারের পুরো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
কারণ, নতুন কর্মী নিয়োগের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। করোনা মহামারির পর যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে যে দ্রুত নিয়োগের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, এখন সেটি অনেকটাই বদলে গেছে। কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে কর্মী ছাঁটাই করছে না, কিন্তু নতুন কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রেও আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
এর ফলে চাকরি খুঁজছেন এমন মানুষের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে নতুন গ্র্যাজুয়েট, পেশা পরিবর্তন করতে চাওয়া কর্মী এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মজুরি। অনেক কর্মীর আয় বাড়লেও মূল্যস্ফীতি সেই বাড়তি আয়ের একটি বড় অংশ খেয়ে ফেলছে। খাবার, বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার বেতন বৃদ্ধির পুরো সুবিধা অনুভব করতে পারছে না। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর প্রকৃত আয় বৃদ্ধির গতি তুলনামূলকভাবে কম।
শ্রমবাজারের ওপর অভিবাসন নীতিরও প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মশক্তি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যার বয়স বাড়ছে, জন্মহার কম এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে কর্মশক্তির সম্প্রসারণে চাপ তৈরি হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
উৎপাদন খাত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন শিল্পে চাকরি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুল্কনীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ চাকরি রয়েছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের তুলনায় প্রায় ২১ হাজার কম।
তবে পরিস্থিতিকে পুরোপুরি দুর্বল শ্রমবাজার হিসেবেও দেখা যাচ্ছে না। বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ হওয়া এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের একটি শক্তিশালী দিক। বড় ধরনের ছাঁটাইও দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ অনেক কোম্পানি বিদ্যমান কর্মীদের ধরে রাখছে, কিন্তু নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এই পরিবর্তন সাধারণ আমেরিকান পরিবারের ভোক্তা আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ যখন চাকরি পাওয়া নিয়ে বেশি সতর্ক হয়ে যায়, তখন বড় ধরনের কেনাকাটা, নতুন গাড়ি কেনা, বাড়ি কেনা কিংবা অন্যান্য বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে।
চাকরির বাজারের এই পরিস্থিতি ফেডারেল রিজার্ভের নীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হয়। চাকরির বাজার দুর্বল হলে সুদের হার নিয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে তার প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আগামী ৩ নভেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে অর্থনীতির এই চিত্র রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন কম বেকারত্বকে অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীরা মূল্যস্ফীতি, চাকরি তৈরির ধীরগতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপকে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমস্যা হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
তবে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যকে অর্থনৈতিক তথ্যের সঙ্গে আলাদা করে দেখা জরুরি। বেকারত্বের হার, নতুন চাকরি সৃষ্টি, মজুরি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের প্রকৃত আয়—সবগুলো সূচক একসঙ্গে বিবেচনা করলেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশি-আমেরিকানসহ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্যও চাকরির বাজারের এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। যারা নতুন চাকরি খুঁজছেন, তারা পেশাগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন শিল্পে কর্মসংস্থানের চাহিদার দিকে নজর দিতে পারেন। বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, নির্মাণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবাখাতে স্থানীয় শ্রমবাজারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চাকরির বাজারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বেকারত্ব কম থাকলেও চাকরি তৈরির গতি কমে যাওয়া। অর্থাৎ বাইরে থেকে শ্রমবাজার স্থিতিশীল মনে হলেও এর ভেতরে গতিশীলতা আগের তুলনায় কমেছে। নির্বাচন সামনে রেখে এই বিষয়টি মার্কিন অর্থনীতি ও রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।