কুমিল্লা থেকে টেক্সাসে বিশ্বস্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাংলাদেশি তরুণ গবেষকের বিশ্বজয়ী সাফল্য
কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ ও বুয়েটের গণ্ডি পেরিয়ে টেক্সাসে বিশ্বস্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় বাংলাদেশি তরুণ গবেষকের নতুন সাফল্য বিশ্বমঞ্চে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত
কুমিল্লা থেকে টেক্সাসে বিশ্বস্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাংলাদেশি তরুণ গবেষকের বিশ্বজয়ী সাফল্য
কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, এরপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জগৎ ড. সাজেদুল করিম তালুকদারের পথচলা এখন আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য গর্বের একটি গল্প। তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, তাঁর বর্তমান পদ, গবেষণাগার পরিচালনা, গবেষণার ক্ষেত্র, গবেষণাপত্র, বিভিন্ন গবেষণা অনুদান এবং সাম্প্রতিক পুরস্কারের বেশির ভাগ তথ্যই যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এল পাসো এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা সূত্রে নিশ্চিত করা যায়। তবে তাঁর শৈশবের শিক্ষাজীবন ও কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের তথ্যের স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ অনলাইনে সীমিত হওয়ায় সেই অংশকে তাঁর দেওয়া জীবনবৃত্তান্তভিত্তিক তথ্য হিসেবে বিবেচনা করাই নিরাপদ।
বর্তমানে ড. সাজেদুল তালুকদার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এল পাসোর কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা-সমৃদ্ধ যন্ত্রশিক্ষা গবেষণাগারের পরিচালক। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষক পরিচিতিতেও তাঁর এই পদ ও গবেষণাগার পরিচালনার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র বিশ্বস্ত, নিরাপদ এবং আক্রমণ-প্রতিরোধী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। পাশাপাশি তিনি অনলাইন সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা, গোপনীয়তা রক্ষা, যন্ত্রশিক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, শিল্পভিত্তিক সংযুক্ত ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কমিশনের কাছ থেকে ৫ লাখ ডলারের গবেষণা অনুদান পায় তাঁর নেতৃত্বাধীন গবেষণা প্রকল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির লক্ষ্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাস্তব সময়ে সাইবার হুমকি শনাক্ত করা এবং নিরাপত্তা জোরদার করা। প্রকল্পে প্রতিটি যন্ত্র ও ব্যবস্থাকে আলাদাভাবে সুরক্ষিত রাখার কৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তাৎক্ষণিক নজরদারি এবং পারমাণবিক স্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার ভার্চুয়াল প্রতিরূপ ব্যবহার করে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গবেষণা অর্থায়নের ক্ষেত্রেও তাঁর সাফল্য উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক নিরাপত্তা প্রকল্পের পাশাপাশি জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশনের নিরাপদ ও বিশ্বস্ত সাইবার পরিসর কর্মসূচির আওতায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৮ ডলারের গবেষণা পুরস্কার রয়েছে। শিল্পভিত্তিক সংযুক্ত যন্ত্রব্যবস্থার সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় মান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে প্রায় ৯৯ হাজার ডলারের প্রকল্প এবং বৈজ্ঞানিক গণনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি নিয়ে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৬ ডলারের গবেষণা অর্থায়নও তাঁর গবেষণা কার্যক্রমের অংশ। এসব নিশ্চিত অনুদানের পরিমাণ যোগ করলে প্রায় ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৫৮৬ ডলার হয়; ফলে তাঁর বহিরাগত গবেষণা অর্থায়ন প্রায় ১০ লাখ ডলারের কাছাকাছি—এই দাবিটি মোটামুটি সঠিক।
গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রেও তাঁর কাজের পরিধি বড়। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এল পাসোর শিক্ষক পরিচিতিতে বলা হয়েছে, তাঁর ১৩০টির বেশি সমকক্ষ-পর্যালোচিত গবেষণাপত্র রয়েছে। এসব গবেষণা কম্পিউটার নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, বিশ্বস্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং পারমাণবিক ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
২০২৬ সালে তাঁর নাম আরও জোরালোভাবে সামনে আসে প্রকৃতি প্রকাশনা গোষ্ঠীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণার মাধ্যমে। গবেষণাটিতে পারমাণবিক চুল্লি নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রভিত্তিক ভিত্তিমডেল ও শারীরিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণা পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণাটি ৫ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত হয় এবং এতে ড. তালুকদার সহ একাধিক গবেষক অংশ নেন। গবেষণাটি দেখায়, সাধারণ কথোপকথননির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বদলে বাস্তব ভৌত ব্যবস্থার নিয়ম ও অনুকরণভিত্তিক যাচাই ব্যবহার করে নিরাপদ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটিকে বাস্তব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে দাবি করা যাবে না; এটি গবেষণা ও অনুকরণভিত্তিক পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।
শিক্ষক হিসেবেও ড. তালুকদার স্বীকৃতি পেয়েছেন। ২০২৫ সালে তিনি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এল পাসোর উচ্চ প্রভাব ও উদ্ভাবনী শিক্ষাদান পুরস্কারের শিক্ষার্থী নির্বাচিত সম্মান লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তে দেওয়া একমাত্র শিক্ষাদান পুরস্কার। ১৮০টির বেশি মনোনয়নের মধ্য থেকে তাঁকে নির্বাচিত করা হয়েছিল।
গবেষণায় নবীন নেতৃত্বের স্বীকৃতিও এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এল পাসোর প্রথমবারের গবেষণা-প্রধানদের জন্য আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে ড. তালুকদারকে পায়োনিয়ারিং গবেষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকাশনায় তাঁর প্রকল্পকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে পাঠানো সংযোগ অনুরোধ ঠেকানোর কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর একাডেমিক যাত্রাও ধারাবাহিক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে স্নাতকোত্তর এবং ২০১৯ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরে পেনসিলভানিয়া ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাউদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় কার্বনডেলে শিক্ষকতা করেন। সেখানে গবেষণা ও শিক্ষকতায় একাধিক স্বীকৃতি পান।
তাঁর সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শিক্ষার্থী তৈরি করা। তাঁর গবেষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষককে পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর প্রথম পিএইচডি শিক্ষার্থী সাই মণি তেজা পুপ্পালা ২০২৬ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করে নিউ মেক্সিকো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। অর্থাৎ নিজের গবেষণার পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের গবেষক তৈরিতেও তাঁর ভূমিকা দৃশ্যমান।
তথ্য যাচাইয়ের ফল বলছে, ড. সাজেদুল করিম তালুকদারকে নিয়ে প্রচারিত মূল সাফল্যের দাবিগুলো ভিত্তিহীন নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি গবেষণা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার তথ্য তাঁর গবেষণা, অর্থায়ন ও একাডেমিক স্বীকৃতির পক্ষে শক্ত প্রমাণ দেয়। তবে তাঁকে “বিশ্বজয়ী” বা “বিশ্বসেরা” বলা আনুষ্ঠানিক কোনো বৈজ্ঞানিক উপাধি নয়; এটি তাঁর অর্জনকে তুলে ধরার সাংবাদিকতামূলক বিশেষণ। একইভাবে তাঁর বয়স “ত্রিশের কোঠায়” এমন দাবির নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, কুমিল্লা ও বুয়েটের শিক্ষাজীবনের পর যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা তাঁর গবেষণা ক্যারিয়ার বর্তমানে বিশ্বস্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও পারমাণবিক অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।