সিঙ্গাপুরে সন্তান জন্মহার কমতেই সরকারি কর্মীদের জন্য চালু হলো বিশেষ পরিচয় সঙ্গী খোঁজার উদ্যোগ

জন্মহার কমে যাওয়া ও দেরিতে বিয়ের প্রবণতার মধ্যে তরুণ সরকারি কর্মীদের পরিচয় ও সম্পর্ক গড়তে নতুন উদ্যোগ সিঙ্গাপুরের

সিঙ্গাপুরে সন্তান জন্মহার কমতেই সরকারি কর্মীদের জন্য চালু হলো বিশেষ পরিচয় সঙ্গী খোঁজার উদ্যোগ

সিঙ্গাপুরে সন্তান জন্মহার কমতেই সরকারি কর্মীদের জন্য চালু হলো বিশেষ পরিচয় সঙ্গী খোঁজার উদ্যোগ


সিঙ্গাপুরে তরুণদের মধ্যে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মীদের জন্য নতুন পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ চালু হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির মতো এটি সরাসরি জন্মহার বাড়ানোর জন্য তৈরি কোনো সরকারি ব্যবস্থা এমনটি এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি সীমিত পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অবিবাহিত সরকারি কর্মকর্তাদের উপযুক্ত সঙ্গীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। 

সিঙ্গাপুর সরকারের প্রযুক্তি সংস্থার কর্মকর্তাদের উদ্যোগে তৈরি এই ব্যবস্থাটির নাম ‘ফার্স্টডেট’। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা হয়। বর্তমানে এটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়; নির্দিষ্ট বয়সসীমার অবিবাহিত সরকারি কর্মকর্তারাই এতে অংশ নিতে পারছেন। একই সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুজনকে পরস্পরের সঙ্গে জুটি করার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে। 

তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, মূল দাবিটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ সত্য হলেও একটি বিষয় অতিরঞ্জিত। সিঙ্গাপুরের জন্মহার সত্যিই ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমেছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাসিন্দাদের মোট প্রজনন হার ছিল প্রতি নারীর জন্য মাত্র শূন্য দশমিক ৮৭ সন্তান, যা ২০২৪ সালের শূন্য দশমিক ৯৭ থেকে আরও কম। একই বছরে জীবিত শিশুজন্মের সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। 

তবে ‘ফার্স্টডেট’ চালুর সরকারি ব্যাখ্যায় সরাসরি বলা হয়নি যে এর মাধ্যমে সন্তান জন্মহার বাড়ানো হবে। উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, মানুষের পছন্দ, মূল্যবোধ, অভ্যাস ও আগ্রহের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে অর্থবহ পরিচয় তৈরি করা এবং প্রচলিত পরিচয় খোঁজার ব্যবস্থায় অতিরিক্ত পছন্দের কারণে যে ক্লান্তি তৈরি হয় তা কমানো। 

ব্যবস্থাটি প্রচলিত পরিচয় খোঁজার মাধ্যমের চেয়ে বেশ আলাদা। অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের সম্পর্কে প্রায় ৩০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। সেখানে আগ্রহ, জীবনযাপন, খাবার, ভ্রমণ, মূল্যবোধ, সম্পর্কের প্রত্যাশা, পছন্দ-অপছন্দ এবং সন্তান নেওয়ার ইচ্ছার মতো বিষয় থাকতে পারে। এসব উত্তরের ভিত্তিতে উপযুক্ত সঙ্গী নির্বাচন করা হয়। 

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অংশগ্রহণকারীদের সামনে একসঙ্গে অসংখ্য সম্ভাব্য সঙ্গীর তালিকা দেখানো হয় না। বরং একটি নির্দিষ্ট সময়পর্বে একজন সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। মিল পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে হয়। দুজনই সম্মতি দিলে তবেই তাদের যোগাযোগের তথ্য পরস্পরের কাছে প্রকাশ করা হয়। 

জুটি নির্ধারণে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘গেল-শ্যাপলি স্থিতিশীল বিবাহ’ পদ্ধতি। এটি বহু বছর আগে তৈরি একটি গাণিতিক পদ্ধতি, যার উদ্দেশ্য হলো দুই পক্ষের পছন্দ বিবেচনা করে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল জুটি তৈরি করা। অর্থনীতিতে এই ধরনের স্থিতিশীল জুটি তৈরির গবেষণার জন্য লয়েড শ্যাপলি ও আলভিন রথ নোবেল স্মারক পুরস্কার পান। তবে এই পদ্ধতি কারও সঙ্গে বাস্তব জীবনে প্রেম বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে পারে না। 

গোপনীয়তার বিষয়টিও উদ্যোগটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য সিঙ্গাপুরের সরকারি ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এতে অংশগ্রহণকারীর বয়স, বৈবাহিক অবস্থা ও সরকারি চাকরির যোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব। মিল হওয়া ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পূর্ণ পরিচয় দেখতে পারেন না। উভয় পক্ষ সম্মতি না দিলে যোগাযোগের তথ্যও প্রকাশ করা হয় না। 

সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি কেন এমন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশটিতে নাগরিকদের মধ্যে ২১ হাজার ৬৭১টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কম। একই সময়ে নাগরিক শিশুজন্মের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৭১, যা এক বছরে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ কম। প্রথম বিয়ের গড় বয়সও আগের দশকের তুলনায় বেড়েছে। 

সিঙ্গাপুর এর আগেও মানুষের বিয়ে ও পরিবার গঠনে উৎসাহ দিতে সরকারি উদ্যোগ নিয়েছে। ১৯৮৪ সালে অবিবাহিত মানুষের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও পরিচয় তৈরির সুযোগ বাড়াতে একটি সরকারি সামাজিক উন্নয়ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বর্তমান উদ্যোগকে সেই দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা নীতির আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

এদিকে দেশটির সরকার পরিবার গঠনে আর্থিক সহায়তা, বাসস্থান, শিশুর যত্ন, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটিসহ বিভিন্ন সুবিধাও দিয়ে আসছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার পরও জন্মহার কমার প্রবণতা পুরোপুরি থামেনি। ফলে শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনা নয়, মানুষের পরিচয়, সম্পর্ক ও পরিবার গঠনের সিদ্ধান্তের সামাজিক কারণগুলো নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। 

তবে ‘ফার্স্টডেট’ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। সিঙ্গাপুরের সরকারি প্রযুক্তি সংস্থা স্পষ্ট করেছে যে পরীক্ষামূলক পর্যায় শেষ হওয়ার পর এটি সাধারণ মানুষের জন্য চালু করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি কতজন এতে অংশ নিয়েছেন, সেই সংখ্যাও কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।  

সত্যিই ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অবিবাহিত সরকারি কর্মীদের জন্য ‘ফার্স্টডেট’ নামে একটি পরীক্ষামূলক পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে এবং দেশটির ২০২৫ সালের প্রজনন হার সত্যিই শূন্য দশমিক ৮৭-এ নেমেছে। কিন্তু এটিকে নিশ্চিতভাবে ‘জন্মহার বাড়ানোর সরকারি প্রকল্প’ বলা এখনই সঠিক নয়। বরং এটি সম্পর্ক তৈরির সুযোগ পরীক্ষা করার একটি সীমিত সরকারি উদ্যোগ, যা ভবিষ্যতে পরিবার গঠনে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর