ন্যানটাকেট উপকূলে নিখোঁজ চিকিৎসাবাহী বিমানের ছয় আরোহীকে মৃত বলে ধারণা কর্তৃপক্ষের এখন
বারমুডা থেকে বোস্টনগামী চিকিৎসাবাহী বিমান নিখোঁজের পর ন্যানটাকেটের কাছে ধ্বংসাবশেষ মিলেছে, ছয় আরোহীর সন্ধান বন্ধ করেছে মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী রবিবার।
ন্যানটাকেট উপকূলে নিখোঁজ চিকিৎসাবাহী বিমানের ছয় আরোহীকে মৃত বলে ধারণা কর্তৃপক্ষের এখন
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ন্যানটাকেট দ্বীপের উপকূলের কাছে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া একটি চিকিৎসাবাহী বিমানের ছয় আরোহীকে মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। কানাডাভিত্তিক চিকিৎসা পরিবহন সংস্থা ল্যাটিটিউড এয়ার অ্যাম্বুলেন্স জানিয়েছে, বিমানে থাকা তাদের চারজন কর্মী, একজন রোগী এবং রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনকে আর জীবিত পাওয়ার আশা নেই। মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনীও দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাপক তল্লাশি চালানোর পর রোববার সন্ধ্যায় নিখোঁজদের জন্য সরাসরি উদ্ধার অভিযান স্থগিত করেছে।
ঘটনাটি ঘটে ৩ অক্টোবর ভোরে। কানাডায় নিবন্ধিত একটি গালফস্ট্রিম জি-১০০ চিকিৎসাবাহী বিমান বারমুডার এল এফ ওয়েড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। বিমানটিতে ছিলেন দুই পাইলট, দুইজন চিকিৎসাকর্মী, একজন রোগী এবং রোগীর একজন স্বজন। চারজন ক্রু ছিলেন কানাডার নাগরিক এবং বাকি দুজন ছিলেন বারমুডার নাগরিক।
উড্ডয়নের প্রায় এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পর বিমানটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উড্ডয়ন-তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিমানটি প্রায় ২৪ হাজার ফুট উচ্চতায় চলার পর অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত নেমে প্রায় ১১ হাজার ফুটে চলে আসে। এরপর বিমানটির অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বোস্টনে অবতরণের কথা ছিল স্থানীয় সময় রাত দেড়টার দিকে।
ঘটনার আগে বিমানের পাইলট বৈদ্যুতিক সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন এবং জরুরি পরিস্থিতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিমান নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে কথোপকথনের শেষ পর্যায়ে পাইলটের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেই বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারায়। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরপরই মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আকাশপথে নজরদারি বিমান, উদ্ধারকারী উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারের পাশাপাশি সমুদ্রপথে নৌযান ও দ্রুতগামী টহলজাহাজ মোতায়েন করা হয়। ন্যানটাকেটের দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক হাজার বর্গমাইলজুড়ে তল্লাশি চালানো হয়। নিউইয়র্কের জাতীয় রক্ষীবাহিনী এবং ম্যাসাচুসেটসের বিভিন্ন সংস্থাও অভিযানে সহায়তা করে।
৩ অক্টোবর রাতেই ন্যানটাকেটের উপকূল থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে একটি ধ্বংসাবশেষের এলাকা শনাক্ত করা হয়। পরে উপকূলরক্ষী বাহিনী নিশ্চিত করে যে, ওই ধ্বংসাবশেষ নিখোঁজ চিকিৎসাবাহী বিমানটিরই অংশ। দুর্ঘটনাস্থলের সমুদ্রের গভীরতা ছিল আনুমানিক ২৪ থেকে ২৭ মিটার।
ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার পরও উদ্ধারকারী দল দ্রুত অভিযান বন্ধ করেনি। কারণ, তখন পর্যন্ত বিমানের ছয় আরোহীর কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকারীরা সম্ভাব্য জীবিতদের সন্ধানে সমুদ্রপৃষ্ঠ, আশপাশের জলসীমা এবং সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। রাতেও একটি উপকূলরক্ষী জাহাজ তল্লাশি চালিয়ে যায়।
রোববার পর্যন্ত তল্লাশি অভিযান প্রায় ৬৬ ঘণ্টা চলে এবং প্রায় ৪ হাজার ৪৪৫ বর্গমাইল এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিমান, হেলিকপ্টার, নৌযান ও অন্যান্য উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করেও কোনো আরোহীকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত উপকূলরক্ষী বাহিনী নিখোঁজদের জন্য পরিচালিত সক্রিয় অনুসন্ধান স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে তল্লাশি স্থগিত হওয়া মানে দুর্ঘটনার তদন্ত শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বিমানটির ধ্বংসাবশেষ, উড্ডয়ন-তথ্য, যোগাযোগের রেকর্ড এবং সম্ভাব্য যান্ত্রিক ত্রুটি বিশ্লেষণ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা বোর্ড, কানাডার পরিবহন নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ করবে। বিমানটির তথ্য ধারণকারী যন্ত্র উদ্ধার করা গেলে দুর্ঘটনার শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
প্রাথমিক তথ্য থেকে বৈদ্যুতিক ত্রুটি, দ্রুত উচ্চতা কমে যাওয়া এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার বিষয়গুলো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে কোনো একটি কারণকে এখনই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়োজাহাজে বৈদ্যুতিক বা যন্ত্রগত সমস্যা দেখা দিলে এবং একই সময়ে খারাপ আবহাওয়া থাকলে পাইলটদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব কেবল সম্ভাব্য কারণ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
বিমানটি পরিচালনাকারী ল্যাটিটিউড এয়ার অ্যাম্বুলেন্স জানিয়েছে, তাদের চারজন কর্মী এবং বিমানে থাকা দুই যাত্রীকে মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
বারমুডা সরকারও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। কানাডার কর্মকর্তারাও ঘটনাটি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন। দুর্ঘটনায় চার কানাডীয় নাগরিক ও দুই বারমুডীয় নাগরিকের মৃত্যু আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিহতদের আনুষ্ঠানিক পরিচয় প্রকাশ এবং দুর্ঘটনার পূর্ণ কারণ নির্ধারণে আরও তদন্ত প্রয়োজন।