লুলা জিততে পারেননি, তবে রিওর উল্লাসে ভুল তথ্য ছড়াল ব্রাজিলের ভোটে

প্রথম দফায় লুলা ও ফ্লাভিও বলসোনারো দ্বিতীয় দফায় উঠেছেন, তবে রিওর উদযাপনকে বিজয় বলা পুরোপুরি সঠিক নয়।

লুলা জিততে পারেননি, তবে রিওর উল্লাসে ভুল তথ্য ছড়াল ব্রাজিলের ভোটে

লুলা জিততে পারেননি, তবে রিওর উল্লাসে ভুল তথ্য ছড়াল ব্রাজিলের ভোটে


ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ফল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, রিও দে জেনেইরোর সাও সালভাদোর চত্বরে লুলা দা সিলভার সমর্থকেরা দ্বিতীয় দফায় ওঠাকে প্রায় বিজয়ের মতো উদযাপন করছেন। একই পোস্টে বলা হয়, ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের ফল আসার সময় ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং লুলা ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটে ছিলেন। পোস্টটির বক্তব্যের একটি অংশ সঠিক হলেও পুরো উপস্থাপনাটি বিভ্রান্তিকর। যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, ব্রাজিলের নির্বাচনে লুলা প্রথম দফায় জয়ী হননি, আবার সাও সালভাদোর চত্বরে তাঁর সমর্থকদের সাম্প্রতিক উদযাপনের দাবিটিও নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বরং এই চত্বরের সঙ্গে ২০২২ সালের লুলার বিজয় উদযাপনের পুরোনো ছবি ও ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে। 

ব্রাজিলের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর প্রথম দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো প্রার্থী বৈধ ভোটের অর্ধেকের বেশি না পাওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দুই প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় লড়বেন। সেই দুই প্রার্থী হলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। দ্বিতীয় দফার ভোট নির্ধারিত হয়েছে ২৫ অক্টোবর। 

প্রায় সম্পূর্ণ ভোট গণনার পর সিনেটের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাভিও বলসোনারো বৈধ ভোটের প্রায় ৪৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ পেয়েছেন এবং লুলা পেয়েছেন প্রায় ৪৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রথম দফায় ফ্লাভিও এগিয়ে থাকলেও কেউই প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাননি। ফলে প্রথম দফার ফলকে লুলার জয় বলা যেমন ভুল, তেমনি দ্বিতীয় দফায় ওঠাকে সরাসরি নির্বাচনে জয় হিসেবে দেখানোও ভুল। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনেও প্রায় একই চিত্র উঠে এসেছে। তাদের হিসাবে ফ্লাভিও প্রায় ৪৭ শতাংশ এবং লুলা প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। প্রথম দফার এই ফল ফ্লাভিওর জন্য প্রত্যাশার তুলনায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে এবং ২৫ অক্টোবরের চূড়ান্ত লড়াইকে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে। 

এখানে পোস্টটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তিকর অংশ হলো রিও দে জেনেইরোর সাও সালভাদোর চত্বরে কথিত উদযাপন। যাচাইয়ে দেখা গেছে, এই একই চত্বর ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার বিজয় উদযাপনের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। গবেষণামূলক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে লুলার সমর্থকেরা সেখানে তাঁর বিজয় উদযাপন করেছিলেন। ফলে বর্তমান নির্বাচনের ফলের সঙ্গে সেই পুরোনো স্থান ও উদযাপনের ছবি বা বর্ণনা মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া মূল পোস্টটির একটি সংস্করণেও একই দাবি দেখা যায়। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য থেকে সাও সালভাদোর চত্বরে ঠিক ওই মুহূর্তে লুলার সমর্থকেরা দ্বিতীয় দফায় ওঠাকে বিজয় হিসেবে উদযাপন করেছেন—এমন স্বতন্ত্র নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে নিরাপদ নয়। 

রিও দে জেনেইরো অবশ্য প্রথম দফার নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারোর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে নিজেকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। রাজ্যটির ভোটের হিসাবে ফ্লাভিও প্রায় ৫৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ বৈধ ভোট পেয়েছেন, যেখানে লুলার ভোট প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ রিও রাজ্যে ফ্লাভিওর ব্যবধান জাতীয় ফলের তুলনায় অনেক বেশি। 

এই কারণে পোস্টে বলা “রিও লুলার মাঠ নয়”—এটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হিসেবে কিছুটা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও অতিরঞ্জিত ভাষা। রিও রাজ্য ফ্লাভিওর পক্ষে শক্তিশালী ফল দিয়েছে, কিন্তু পুরো ব্রাজিলের নির্বাচনকে শুধু রিওর ফল দিয়ে বিচার করা যায় না। জাতীয় পর্যায়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম এবং চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ হবে দ্বিতীয় দফায়।

অন্যদিকে বাহিয়া রাজ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে লুলা প্রায় ৬৪ দশমিক ২০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, আর ফ্লাভিও পেয়েছেন প্রায় ৩০ দশমিক ০১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্রাজিলের বিভিন্ন অঞ্চলে ভোটের চিত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এই আঞ্চলিক বিভাজনই দ্বিতীয় দফার প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। 

ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৫ বছর বয়সী সিনেটর এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। তিনি প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তাঁর প্রচারণায় অপরাধ দমন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবর্তনের বার্তা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। প্রথম দফায় প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ফল পাওয়ার পর তাঁর শিবির দ্বিতীয় দফায় অন্যান্য প্রার্থীর ভোটারদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করবে। 

লুলা ৮০ বছর বয়সে আবারও প্রেসিডেন্ট পদে লড়ছেন। তিনি ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ২০২৩ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন। এবার তিনি পরপর নয়, চতুর্থ মেয়াদের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর প্রচারণায় সামাজিক কর্মসূচি, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। 

প্রথম দফার ফল ঘোষণার পর উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরছে। ফ্লাভিও বলেছেন, ফলাফল ব্রাজিলের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে। অন্যদিকে লুলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও তিনি এখনো নির্বাচনের বাইরে যাননি। ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় দ্বিতীয় দফার ভোট সম্পূর্ণ নতুন প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রথম দফায় বাদ পড়া প্রার্থীদের ভোটারদের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর