১৯৩৮, ২৪ অক্টোবর: লিপস্কি-রিবেনত্রপ বৈঠকে উঠে আসে ইহুদি নির্বাসন ও উপনিবেশ প্রশ্ন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পোল্যান্ড ও নাৎসি জার্মানির আলোচনায় ইহুদি নির্বাসন, উপনিবেশ এবং ডানজিগ প্রশ্ন কীভাবে জড়িয়ে পড়েছিল, তার গুরুত্বপূর্ণ দলিল এটি।
১৯৩৮, ২৪ অক্টোবর: লিপস্কি-রিবেনত্রপ বৈঠকে উঠে আসে ইহুদি নির্বাসন ও উপনিবেশ প্রশ্ন
১৯৩৮ সালের ২৪ অক্টোবর ইউরোপ যখন ক্রমেই আরেকটি মহাযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন জার্মানি ও পোল্যান্ডের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী হয় একটি বৈঠক। পোল্যান্ডের জার্মানিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত জোজেফ লিপস্কি এবং তৎকালীন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োয়াখিম ফন রিবেনত্রপের মধ্যে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বাভারিয়ার বের্গটেসগাডেনে। বৈঠকটির প্রধান আলোচ্য ছিল দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বিরোধ, বিশেষ করে ডানজিগ, পোলিশ করিডোর এবং জার্মানির বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবি। তবে একই সময়ে ইহুদিদের দেশান্তর এবং আফ্রিকায় সম্ভাব্য বসতি স্থাপনের মতো বিষয়ও ইউরোপীয় কূটনীতিতে আলোচিত হচ্ছিল।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন। ২৪ অক্টোবরের লিপস্কি-রিবেনত্রপ বৈঠককে সরাসরি শুধু ইহুদি নির্বাসন বা উপনিবেশ পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক হিসেবে উপস্থাপন করা অতিরঞ্জিত। ঐ বৈঠকের মূল বিষয় ছিল জার্মান-পোলিশ সম্পর্কের তথাকথিত সামগ্রিক সমাধান। রিবেনত্রপ পোল্যান্ডকে ডানজিগ জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয় মেনে নেওয়া, পোলিশ ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে পূর্ব প্রুশিয়ার সঙ্গে জার্মানির যোগাযোগের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং জার্মান নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক জোটে পোল্যান্ডকে আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রস্তাব দেন। পোলিশ সরকার এসব দাবিকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করে।
ইহুদিদের দেশান্তরের প্রশ্নটি অবশ্য সেই সময়ের পোলিশ-জার্মান কূটনীতির বাইরে ছিল না। ১৯৩৮ সালে নাৎসি জার্মানি ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। জার্মানিতে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক পোলিশ নাগরিক ইহুদি তখন বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। অক্টোবরের শেষ দিকে জার্মান কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৭ হাজার পোলিশ নাগরিক ইহুদিকে জার্মানি থেকে বহিষ্কার করে। তাদের একটি বড় অংশ সীমান্তবর্তী এলাকায় আটকা পড়ে এবং অনেকে পরে আশ্রয়শিবিরে যেতে বাধ্য হন। ইতিহাসে এই ঘটনাটি পোলিশ অভিযান নামে পরিচিত।
এই পরিস্থিতির মাত্র কয়েক দিন আগে পোল্যান্ড নিজস্ব নাগরিকত্ব ও পাসপোর্টসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে কাজ করছিল। মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে দেখা যায়, পোলিশ সরকার আশঙ্কা করছিল যে জার্মানি বিপুলসংখ্যক পোলিশ ইহুদিকে জোর করে পোল্যান্ডে ঠেলে দিতে পারে। ২৯ অক্টোবরের একটি মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় উল্লেখ করা হয়, জার্মানি ইতোমধ্যে হাজার হাজার পোলিশ ইহুদিকে বহিষ্কার শুরু করেছে এবং আরও বহু মানুষ সীমান্তে আসার আশঙ্কা ছিল। অর্থাৎ ২৪ অক্টোবরের বৈঠকের সময় ইহুদি জনগোষ্ঠীকে ঘিরে সংকট বাস্তবেই তীব্র হয়ে উঠেছিল।
পোলিশ সরকারের পক্ষ থেকেও ইহুদি জনগোষ্ঠীর দেশান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আগেই আলোচনা চলছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সংরক্ষিত নথিতে দেখা যায়, ১৯৩৭ সালেই পোলিশ সরকার পোল্যান্ডের ইহুদিদের জন্য ইউরোপের বাইরে নতুন বসতির সম্ভাবনা খুঁজছিল। প্যালেস্টাইন ছাড়াও মাদাগাস্কার, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল এবং অন্যান্য স্থানে ইহুদি অভিবাসনের সম্ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছিল। পোলিশ প্রতিনিধিরা এসব অঞ্চলে সম্ভাব্য বসতি স্থাপনের ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন।
১৯৩৮ সালে এই চিন্তা আরও জটিল রূপ নেয়। জার্মান নেতৃত্বও ইহুদিদের ইউরোপ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ধারণা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করছিল। পরে যে মাদাগাস্কার পরিকল্পনা নাৎসি নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তার প্রাথমিক ধারণাগুলোর কিছু আলোচনা ১৯৩৮ সালেই দেখা যায়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। ১৯৩৮ সালের দেশান্তর পরিকল্পনাগুলোকে সরাসরি পরবর্তী গণহত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। তখন নাৎসি নেতৃত্বের নীতিতে জোরপূর্বক দেশান্তর, সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া এবং ইহুদিদের ইউরোপ থেকে বিতাড়নের চিন্তা প্রবল ছিল; পরিকল্পিত গণহত্যার শিল্পায়িত কাঠামো পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে।
জোজেফ লিপস্কির ভূমিকা নিয়েও ইতিহাসে বিতর্ক রয়েছে। তিনি ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে পোল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং পোলিশ পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে নাৎসি সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৩৮ সালের অক্টোবরে তিনি শুধু রিবেনত্রপের সঙ্গেই নয়, আদলফ হিটলারের সঙ্গেও ইহুদি প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ঐ আলোচনায় আফ্রিকার কোনো অঞ্চলে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের ধারণা উঠে আসে বলে ঐতিহাসিক নথি ও গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে পোলিশ রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে ইহুদি অভিবাসনের জন্য নতুন ভূখণ্ড খোঁজার আগ্রহের কথা স্পষ্টভাবে উঠে আসে। একই নথিতে জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর চলমান নিপীড়নের সমালোচনাও নথিবদ্ধ হয়। ফলে সে সময়ের পোলিশ নীতিকে একমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। একদিকে পোলিশ রাষ্ট্রের মধ্যে ইহুদি জনগোষ্ঠীকে দেশান্তরের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল, অন্যদিকে নাৎসি জার্মানির নির্যাতন ও জোরপূর্বক বহিষ্কারের বিরুদ্ধেও কূটনৈতিক আপত্তি জানানো হয়েছিল।
২৪ অক্টোবর ১৯৩৮-এর লিপস্কি-রিবেনত্রপ বৈঠক ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের ইউরোপীয় কূটনীতির একটি জটিল মুহূর্ত। বৈঠকের মূল কেন্দ্র ছিল জার্মানির ভূখণ্ডগত ও রাজনৈতিক দাবি, কিন্তু একই সময়ে ইহুদি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ, জোরপূর্বক দেশান্তর এবং আফ্রিকায় সম্ভাব্য বসতি স্থাপনের চিন্তাও বৃহত্তর কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছিল। তাই প্রচারিত দাবিটিকে পুরোপুরি মিথ্যা বলা যায় না, কিন্তু এটিকে সরলভাবে “ইহুদিদের নির্বাসন নিয়ে লিপস্কি ও রিবেনত্রপের বৈঠক” বলা ঐতিহাসিকভাবে অসম্পূর্ণ। বেশি নির্ভুল বর্ণনা হলো ২৪ অক্টোবরের বৈঠকের প্রধান বিষয় ছিল জার্মান-পোলিশ রাজনৈতিক বিরোধ, আর ইহুদি দেশান্তর ও উপনিবেশের ধারণা ছিল সেই সময়ের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।