ফ্লাভিওর জয়ে ব্রাজিলে বাজল পরিবর্তনের ঘণ্টা, লুলার সঙ্গে মহারণ ২৫ অক্টোবর
প্রথম দফায় এগিয়ে গেলেন ফ্লাভিও বলসোনারো, লুলাকে পেছনে ফেলে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এবার দ্বিতীয় দফার লড়াই নিশ্চিত।
ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় বড় চমক দেখিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ও ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ভোটের গণনায় তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে পেছনে ফেলে প্রথম অবস্থানে উঠে এসেছেন। ফলে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন দ্বিতীয় দফার ভোটে গড়িয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর মুখোমুখি হবেন ফ্লাভিও ও লুলা।
ভোট গণনার শেষ পর্যায়ের হিসাবে ফ্লাভিও প্রায় ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ বৈধ ভোট পেয়েছেন, আর লুলার ভোট প্রায় ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান তিন শতাংশেরও কম। প্রায় ৯৮ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের ফল প্রকাশের সময়ও ফ্লাভিও এগিয়ে ছিলেন। পরবর্তী গণনায় ব্যবধান কিছুটা পরিবর্তিত হলেও প্রথম দফায় কে এগিয়ে ছিলেন, তা নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকেনি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথম দফায় সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া মানেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া নয়। ব্রাজিলের নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হতে হলে বৈধ ভোটের অর্ধেকের বেশি পেতে হয়। কোনো প্রার্থী সেই সীমা অতিক্রম করতে না পারলে প্রথম দুই অবস্থানে থাকা প্রার্থীদের নিয়ে দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ব্রাজিলের সর্বোচ্চ নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় দফার ভোট ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে।
প্রথম দফার ফলাফল তাই ফ্লাভিও বলসোনারোর জন্য নিঃসন্দেহে বড় রাজনৈতিক সাফল্য হলেও এটি এখনো চূড়ান্ত বিজয় নয়। বরং দ্বিতীয় দফায় তাকে আরও বিস্তৃত ভোটারগোষ্ঠীর সমর্থন অর্জন করতে হবে। প্রথম দফায় তার পেছনে থাকা অন্য ডানপন্থী ও রক্ষণশীল প্রার্থীদের ভোট এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তৃতীয় ও পরবর্তী অবস্থানে থাকা প্রার্থীদের ভোটের একটি অংশ ফ্লাভিওর দিকে যেতে পারে। তবে সেটি নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে লুলার জন্য ফলাফলটি বড় ধাক্কা। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে লুলা প্রথম দফায় এগিয়ে ছিলেন। সর্বশেষ একটি বহুল আলোচিত জরিপে বৈধ ভোটের হিসাবে লুলার সমর্থন ছিল ৪৫ শতাংশ এবং ফ্লাভিওর ৪০ শতাংশ। কিন্তু বাস্তব ভোটের ফল সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। ফ্লাভিও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ভালো ফল করেছেন এবং লুলাকে প্রথমবারের মতো প্রথম দফার ভোটে পেছনে ফেলেছেন।
ফ্লাভিওর এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ ও জননিরাপত্তা, সরকারি ব্যয়, অর্থনীতি এবং লুলা সরকারের প্রতি অসন্তোষ—এসব বিষয় নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ফ্লাভিও কঠোর অপরাধ দমন, সরকারি ব্যয় কমানো এবং অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার প্রচারে রক্ষণশীল মূল্যবোধ ও নিরাপত্তা ইস্যুও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ফ্লাভিওর রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ অবশ্যই তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। তিনি জাইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ ছেলে এবং বাবার রাজনৈতিক ধারার অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। ফলে এই নির্বাচনকে অনেকেই লুলাবাদ ও বলসোনারোপন্থী রাজনীতির আরেকটি বড় সংঘাত হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে ব্রাজিলের রাজনীতিতে ডানপন্থীদের শক্তি যে এখনো যথেষ্ট, প্রথম দফার ফলাফল সেটিও স্পষ্ট করেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির একটি অংশ নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে ফ্লাভিও বলসোনারোর জয়কে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফল হিসেবে উপস্থাপন করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে ওই সংস্থার অর্থায়ন বন্ধের সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না।
একইভাবে ফ্লাভিওকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার দাবিও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন। দুজনের মধ্যে রক্ষণশীল ও ডানপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের মিল থাকলেও, সেটিকে সরাসরি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক জোট হিসেবে উল্লেখ করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লুলার শিবির যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে ফ্লাভিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখানোর আগে আরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
ব্রাজিলের নির্বাচনে এবার প্রায় ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ভোটার ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি গভর্নর, সিনেটর এবং নিম্নকক্ষের সদস্য নির্বাচনের ভোটও একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়, জাতীয় আইনসভায় ডান ও বামপন্থী শক্তির ভারসাম্যও আগামী সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্বিতীয় দফার লড়াই এখন সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। প্রথম দফায় ফ্লাভিও এগিয়ে থাকলেও লুলার শক্তিশালী ভোটব্যাংক রয়েছে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। ভোট গণনার শেষ পর্যায়ে ওই অঞ্চলের ভোট যুক্ত হওয়ার সঙ্গে ফ্লাভিওর ব্যবধান কমেছিল। ফলে দ্বিতীয় দফায় আঞ্চলিক ভোটের ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ফ্লাভিও যদি প্রথম দফার ডানপন্থী ভোটকে নিজের দিকে একত্র করতে পারেন, তাহলে তিনি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবেন। অন্যদিকে লুলা যদি মধ্যপন্থী ও সামাজিক কল্যাণভিত্তিক ভোটারদের পাশাপাশি প্রথম দফায় বাদ পড়া প্রার্থীদের সমর্থন আদায় করতে পারেন, তাহলে ব্যবধান ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তারও রয়েছে। তাই এখনই কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করার সুযোগ নেই।
৪ অক্টোবরের ভোট ব্রাজিলের রাজনীতিতে একটি বড় মোড় তৈরি করেছে। ফ্লাভিও বলসোনারো প্রথম দফায় লুলাকে পেছনে ফেলেছেন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তাকে আরও একটি কঠিন লড়াই পার হতে হবে। ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফাই নির্ধারণ করবে ব্রাজিল আবার বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ধারায় ফিরবে, নাকি লুলা চতুর্থবারের মতো অ-ধারাবাহিক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইতিহাস গড়বেন।




