সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে সব বি-১ বোমারু বিমান সরাল যুক্তরাষ্ট্র

সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় ব্রিটেনে থাকা বি-১ বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছে, ইরানের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে তদন্ত চললেও তেহরান দায় অস্বীকার করেছে।

সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে সব বি-১ বোমারু বিমান সরাল যুক্তরাষ্ট্র

সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে সব বি-১ বোমারু বিমান সরাল যুক্তরাষ্ট্র


যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারে অবস্থিত রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, ঘাঁটিতে মোতায়েন থাকা সব মার্কিন বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রের নিজ নিজ ঘাঁটিতে ফিরে গেছে। সাম্প্রতিক একটি কথিত সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা এবং এর সম্ভাব্য বিদেশি যোগসূত্র নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 


ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে থাকা প্রায় এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব বিমান ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর সরাসরি বলেনি যে ইরানই হামলার পরিকল্পনার জন্য দায়ী। বরং নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। 


ঘটনাটির সূত্রপাত হয় ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে। ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছাকাছি সন্দেহজনক কয়েকটি গাড়ি ও মুখোশধারী ব্যক্তির গতিবিধি স্থানীয় একজন বাসিন্দার নজরে আসে। পরে পুলিশের কাছে খবর দেওয়া হলে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত সেখানে পৌঁছে যায়। তিনটি সন্দেহজনক গাড়িকে ঘিরে অভিযান চালানো হয় এবং পাঁচজন ব্রিটিশ নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের বয়স ছিল বিশের কোঠায়। প্রথমে বিস্ফোরকসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহ এবং পরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছিল। 


ঘটনাস্থলে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী বিশেষজ্ঞরাও পাঠানো হয়। স্থানীয় একটি এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয় এবং আশপাশের বেশ কয়েকটি পরিবারের লোকজনকে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তদন্তকারীরা সন্দেহজনক গাড়িগুলো পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাড়িগুলোতে জ্বালানি পাওয়া গেলেও কার্যকর বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। পরে আটক পাঁচজনকেই কঠোর শর্তে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ হয়নি। 


এরপর তদন্ত আরও বিস্তৃত হয়। ২৫ বছর বয়সী একজন যুক্তরাজ্য ও ইরানের দ্বৈত নাগরিককে লন্ডনে আটক করা হয়। তাকেও ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি ঘিরে কথিত হামলার প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাকেও জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। ফলে এই তদন্তে মোট ছয়জনকে আটক করার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 


তদন্তের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হচ্ছে ইরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এখনো চূড়ান্তভাবে বলেননি যে ইরান সরকার সরাসরি এই পরিকল্পনার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ব্রিটিশ রাজনীতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিটেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। 


ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গত সপ্তাহে বলেছিলেন, ঘটনার সঙ্গে ইরানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে শক্তিশালী ইঙ্গিত রয়েছে। তবে তদন্ত চলমান থাকায় তিনি বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। অন্যদিকে ইরান এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। 


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর আগে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তারা মার্কিন স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি করার চেষ্টা করছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও এই ঘটনায় কোনো বিদেশি পক্ষের হাত থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তবে এসব রাজনৈতিক বক্তব্য এখনো তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল নয়। 


এই কারণেই তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইরান নিশ্চিতভাবে এই হামলার পরিকল্পনা করেছিল। এই দাবিটি এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ইরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা তদন্ত করছে, কিন্তু ইরান দায় অস্বীকার করেছে এবং আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও এখনো এমন কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি, যাতে তাদের ইরানি রাষ্ট্রের নির্দেশে কাজ করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। 


ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক স্থাপনা। এটি লন্ডনের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটি থেকে বিভিন্ন দূরপাল্লার বোমারু বিমান পরিচালনা করে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের সময়ও ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চলমান ইরান যুদ্ধের সময় এখান থেকে বি-১সহ অন্যান্য মার্কিন বোমারু বিমান পরিচালিত হচ্ছিল। 


সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ঘাঁটিটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। যুক্তরাজ্য মার্কিন বাহিনীকে নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষামূলক সামরিক কার্যক্রমের জন্য তাদের কয়েকটি ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এর মধ্যে ফেয়ারফোর্ডও ছিল। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে এই ঘাঁটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পরিণত হয়। 


ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী এর আগেও যুক্তরাজ্যের মাটিতে থাকা এমন সামরিক ঘাঁটিকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনার হুমকি দিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ঘাঁটি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে তেহরানের অবস্থান কঠোর। এ কারণে ফেয়ারফোর্ডে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াকে ব্রিটিশ ও মার্কিন কর্মকর্তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। 


যুক্তরাষ্ট্রের সব বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পরও ফেয়ারফোর্ড থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক সদস্য ও অন্যান্য সহযোগী কার্যক্রম থাকার কথা রয়েছে। তবে সেখানে স্থায়ীভাবে বা সাময়িকভাবে থাকা বোমারু বিমানগুলো আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। 


মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বাহিনী বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে দ্রুত সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। অর্থাৎ ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমান সরিয়ে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে বি-১ বিমানগুলো সামরিকভাবে অকার্যকর হয়ে গেছে বা ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাচ্ছে। বরং নিরাপত্তার ঝুঁকি কমিয়ে বিমানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। 


ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমান সরানোর সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ব্রিটিশ পুলিশ কথিত হামলার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং নতুন করে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ফলে মার্কিন সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 


তবে বর্তমানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র ফেয়ারফোর্ডে মোতায়েন থাকা সব বোমারু বিমান দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তের পেছনে নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। কথিত হামলার সঙ্গে ইরানের কোনো প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় নির্দেশ বা সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। তাই ইরানকে হামলার নিশ্চিত পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা এই মুহূর্তে তথ্যগতভাবে অতিরঞ্জিত হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকা একটি তদন্তাধীন অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর