মা গ্রেপ্তার, অসহায় প্রতিবন্ধী শিশু; শারমিনের ঘটনায় আইনের প্রয়োগ নিয়ে মানবিক প্রশ্ন
মা গ্রেপ্তার, পাশে নেই দেখভালের কেউ ,প্রতিবন্ধী শিশুর চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উঠেছে গভীর মানবিক প্রশ্ন। আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি শিশুটির অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতের আহ্বান।
মা গ্রেপ্তার, অসহায় প্রতিবন্ধী শিশু; শারমিনের ঘটনায় আইনের প্রয়োগ নিয়ে মানবিক প্রশ্ন
রাজধানীর লালবাগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় শারমিন সুলতানা সর্মি নামে এক নারীকে গ্রেপ্তারের পর তার ৭ থেকে ৮ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী সন্তানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর মানবিক উদ্বেগ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ওই মামলার সন্দেহভাজন আসামি। গ্রেপ্তারকে ঘিরে মবের মাধ্যমে আটকের অভিযোগ, পারিবারিক ও সম্পত্তি বিরোধের দাবি এবং তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে।
রাজধানীর লালবাগের শেখ সাহেব বাজার এলাকা থেকে ৪৪ বছর বয়সী শারমিন সুলতানা সর্মিকে গ্রেপ্তার করে লালবাগ থানা পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় তিনি সন্দেহভাজন আসামি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করার পর সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলাটির পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শারমিন সুলতানা সর্মি ইডেন মহিলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, আওয়ামী লীগের একটি উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক এবং ২০১৭ থেকে ২০২২ মেয়াদে যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই রাজনৈতিক পরিচয় বর্তমানে গ্রেপ্তারের ঘটনায় অন্যতম আলোচিত বিষয়।
তবে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য বা মিথ্যা হয়ে যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শারমিনের পারিবারিক পরিস্থিতি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার ৭ থেকে ৮ বছর বয়সী সন্তান প্রতিবন্ধী। শিশুটির নিয়মিত ওষুধ, ব্যক্তিগত পরিচর্যা এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে রাতে শিশুটির দেখাশোনার জন্য তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জানিয়েছেন।
শারমিনের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, মা-বাবা ছাড়া শিশুটিকে দেখাশোনার মতো আর কেউ নেই। শিশুটির দেখভাল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক চাপ ও মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
শারমিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর সবচেয়ে বড় মানবিক প্রশ্নটি এখন তার প্রতিবন্ধী সন্তানকে ঘিরে। একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের এখতিয়ার। কিন্তু সেই ব্যক্তির ওপর যদি কোনো প্রতিবন্ধী শিশু সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল থাকে, তাহলে শিশুটির চিকিৎসা, খাবার, পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে—এই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
শিশুটি কোনো মামলার আসামি নয়। তার মায়ের রাজনৈতিক পরিচয়ও তার নয়। মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের দায় শিশুটির ওপর বর্তানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিশুটির স্বার্থকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে শারমিনকে গ্রেপ্তারের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার পক্ষ থেকে মবের মাধ্যমে তাকে আটক করার অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পারিবারিক ও সম্পত্তি বিরোধের সঙ্গে ঘটনার যোগসূত্র থাকার দাবিও সামনে এসেছে।
যদি মবের মাধ্যমে কাউকে আটক করা হয়ে থাকে, সেটিও আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর যদি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে সেটিরও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে আইন প্রয়োগের ধরন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতেও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে।
বর্তমান সময়েও রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একটি সরকারের সময়ে যে ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, ক্ষমতার পালাবদলের পর একই ধরনের আচরণ অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও পুনরাবৃত্তি হলে সেটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেয় না।
অতীতের অন্যায়ের বিচার প্রয়োজন। কিন্তু অতীতের অন্যায় বর্তমানের অন্যায়ের বৈধতা হতে পারে না।
একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী যদি অপরাধ করেন, তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ যেন আগেই অপরাধী হিসেবে বিবেচিত না হন—এটিও আইনের শাসনের মৌলিক শর্ত।
একইভাবে কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হলেও তার সন্তান যেন তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শারমিন সুলতানা সর্মির ঘটনা তাই শুধু একটি গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়। এটি আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা, মব সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ এবং শিশু সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অবশ্য ওই প্রতিবন্ধী শিশুকে ঘিরে।
মা যদি কারাগারে থাকেন, তাহলে শিশুটির নিয়মিত ওষুধ কে দেবে? কে তাকে খাওয়াবে? কে তাকে গোসল করাবে? রাতে অসুস্থ হলে কে পাশে থাকবে? তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে?
এসব প্রশ্ন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এগুলো সম্পূর্ণ মানবিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্ন।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধের অভিযোগের বিচার হবে আদালতে, মবের হাতে নয়। রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচার হবে ভোট ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়। আর কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ তার বাবা-মায়ের রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলার কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে না—এটাই হওয়া উচিত আইনের শাসনের ন্যূনতম মানদণ্ড।
শারমিন সুলতানা সর্মির বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া এখন চলমান। তিনি জামিন পাওয়ার যোগ্য কি না, সেটিও আদালতের বিষয়। একই সময়ে তার প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কারণ ন্যায়বিচার শুধু একজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করার নাম নয়। ন্যায়বিচার হলো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তের আইনি অধিকার, সত্য প্রমাণিত হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং একই সঙ্গে নিরপরাধ ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করা।
শারমিনের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেই ভারসাম্য কতটা নিশ্চিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।