সৌদি আহ্বানেও ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধে জড়াচ্ছেন না ট্রাম্প, বাড়ছে নতুন আঞ্চলিক উত্তেজনা
সৌদি আরবের সামরিক সহায়তার অনুরোধ সত্ত্বেও ইয়েমেনে সরাসরি হামলায় না গিয়ে তথ্য সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকছে যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা।
সৌদি আহ্বানেও ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধে জড়াচ্ছেন না ট্রাম্প, বাড়ছে নতুন আঞ্চলিক উত্তেজনা
ইয়েমেনকে ঘিরে সৌদি আরব ও আনসারুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পরও সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার অবস্থান বজায় রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সৌদি আরব বারবার ওয়াশিংটনের কাছে সামরিক সহায়তা এবং আনসারুল্লাহর অবস্থানে হামলার জন্য মার্কিন অংশগ্রহণ চাইলেও এখন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি অভিযানে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এই অবস্থানের বিষয়টি উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে ইয়েমেনের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছে। আনসারুল্লাহ বাহিনী সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে। লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে তাদের অগ্রযাত্রা এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে অবস্থান শক্তিশালী করার ঘটনায় সৌদি আরবের উদ্বেগ বেড়েছে। এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালিত হয়।
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই সৌদি আরবের সঙ্গে আনসারুল্লাহর সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। সৌদি-সমর্থিত বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে আনসারুল্লাহর অগ্রযাত্রার পাশাপাশি সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান হামলার অভিযোগও সামনে এসেছে। এর পাল্টা হিসেবে সৌদি আরব ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। ফলে ২০২২ সালের পর অপেক্ষাকৃত কমে আসা সংঘাত আবার বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তা চেয়েছেন বলে একাধিক মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে সৌদি যুবরাজ ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তত দুবার ফোনে কথা বলেন এবং আনসারুল্লাহর বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার অনুরোধ জানান। ট্রাম্প সরাসরি মার্কিন হামলায় সম্মতি দেননি। এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি এবং লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দেয়।
পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে ট্রাম্প প্রশাসন ইয়েমেনে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা সম্ভাব্য বিমান হামলার পরিকল্পনাও প্রস্তুত করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প সরাসরি হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এর অন্যতম কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্র খুলে যাওয়ার ঝুঁকি এবং আনসারুল্লাহকে আঘাত করলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানকে কেবল নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি সরে যায়নি, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধেও প্রবেশ করেনি। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে চাইছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু করার ঝুঁকি এড়াতে চাইছে।
এরই মধ্যে সৌদি আরব ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আনসারুল্লাহর বিরুদ্ধে বড় ধরনের পাল্টা অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। লক্ষ্য হিসেবে লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই অভিযানে সৌদি বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা থাকার কথা বলা হলেও মার্কিন সেনাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা আপাতত নেই।
এদিকে আনসারুল্লাহর সাম্প্রতিক তৎপরতা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। অক্টোবরের ৩ তারিখে রিয়াদে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান হামলার দাবি করেছে আনসারুল্লাহ। হামলার পর ওই এলাকার কাছে আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ফলে ঘটনাটির পূর্ণ সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এই সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাব আল-মান্দাব প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে জাহাজ চলাচলের খরচ বাড়তে পারে, পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নৌপথে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মানবিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে সাম্প্রতিক সহিংসতায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, খাদ্যসংকট, চিকিৎসা সংকট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে নতুন সংঘাত ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করছে।
প্রচারিত দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সৌদি আরবের অনুরোধ সত্ত্বেও ট্রাম্প এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা অনুমোদন করেননি তা একাধিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে সমর্থিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে নেই; সৌদি আরবকে গোয়েন্দা ও লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব বড় ধরনের পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোর নীতি আপাতত বহাল থাকলেও ইয়েমেন পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।