লিরা রক্ষায় তুরস্কের স্বর্ণ বিক্রি, অর্ধ বছরে কমেছে ৮৩ টন মজুত
লিরার স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলাতে তুরস্ক স্বর্ণ বিক্রি বাড়িয়েছে, যা রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
লিরা রক্ষায় তুরস্কের স্বর্ণ বিক্রি, অর্ধ বছরে কমেছে ৮৩ টন মজুত
তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ বিক্রির পরিমাণ ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ নজর কেড়েছে। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে তুরস্ক প্রায় ৮৩ টন স্বর্ণ বিক্রি করেছে। এর ফলে দেশটি ওই সময়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় স্বর্ণ বিক্রেতায় পরিণত হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির মতো পুরো ৮৩ টন স্বর্ণ ৪ হাজার ২০০ ডলার প্রতি আউন্স দরে বিক্রি করে ঠিক ১১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে এমন সরাসরি প্রমাণ নেই।
বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের হিসাব বলছে, তুরস্কের বিক্রির বড় অংশ হয়েছিল বছরের প্রথম প্রান্তিকে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় চার টনে নেমে আসে। একই সময়ে স্বর্ণের বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়ার জন্য করা কিছু অদলবদল চুক্তির পরিমাণও কমেছে। জুনের শেষে এ ধরনের চুক্তির পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ের ৮০ টনের বেশি থেকে প্রায় ৬০ টনে নেমে আসে।
পরবর্তী হিসাবেও তুরস্কের বিক্রির প্রবণতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে আরও প্রায় এক টন স্বর্ণ বিক্রি হওয়ায় বছরের মোট বিক্রির পরিমাণ ৮৫ টনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ৮৩ টন সংখ্যা মূলত বছরের প্রথমার্ধের হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত, পুরো বছরের চূড়ান্ত সংখ্যা নয়।
স্বর্ণ বিক্রির পেছনে তুরস্কের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। দেশটির মুদ্রা লিরা দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক অর্থপ্রদানের চাপ এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয়ের কারণে চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা স্বর্ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ তারল্য সম্পদ হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রয়োজনের সময় স্বর্ণ বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা অথবা স্বর্ণের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব নীতিতেও স্বর্ণ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে সরাসরি স্বর্ণ কেনাবেচা, স্বর্ণের আমানত, বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে স্বর্ণের অদলবদল এবং স্বর্ণের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের মতো ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ স্বর্ণের মজুত শুধু দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ নয়, প্রয়োজনের সময় বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য ব্যবস্থাপনার একটি উপায় হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
২০২৬ সালের শুরুতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের চাপ তুরস্কের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার স্থিতিশীল রাখতে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করেছিল এবং একই সময়ে প্রায় ২২ টন স্বর্ণ বিক্রির হিসাবও সামনে আসে। ব্যাংকারদের হিসাব অনুযায়ী, স্বর্ণভিত্তিক অদলবদলসহ ব্যবস্থার পরিমাণ ছিল আরও বেশি।
তবে স্বর্ণ বিক্রিকে কেবল লিরা রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। তুরস্কে স্বর্ণের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও অনেক বেশি। গয়না, স্বর্ণমুদ্রা ও বার কেনার প্রবণতা দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতীতে স্বর্ণ আমদানিতে বিধিনিষেধ তৈরি হলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুত ব্যবহারের নজিরও রয়েছে। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদ জানিয়েছে, অতীতেও তুরস্কের স্বর্ণ বিক্রির সঙ্গে স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতির সম্পর্ক দেখা গেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামও ২০২৬ সালে ব্যাপক ওঠানামা করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম প্রায় ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। ২৮ সেপ্টেম্বর এক পর্যায়ে দাম ৪ হাজার ১১০ ডলারের কাছাকাছি নেমেছিল। পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও উচ্চ সুদের প্রত্যাশা, শক্তিশালী ডলার এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
তুরস্কের জন্য স্বর্ণ বিক্রির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ব্যবস্থাপনা। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একই সঙ্গে মুদ্রার স্থিতিশীলতা, আমদানি ব্যয় এবং আর্থিক বাজারের আস্থা তিনটি বিষয় সামলাতে হয়। স্বর্ণ তখন একটি বিকল্প সম্পদ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
তবে অতিরিক্ত স্বর্ণ বিক্রির ঝুঁকিও রয়েছে। স্বর্ণের মজুত কমে গেলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক বাজারে চাপ মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সম্পদ কমে যায়। ফলে বিক্রির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক চাপ কমানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে মজুতের কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, তুরস্কের ৮৩ টন স্বর্ণ বিক্রির তথ্যটি সত্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত। কিন্তু ১১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যে ঠিক ৪ হাজার ২০০ ডলার প্রতি আউন্স দরে পুরো স্বর্ণ বিক্রির দাবি নির্ভুল নয়। বরং এটি বিভিন্ন সময়ের স্বর্ণের বাজারমূল্য ও বিক্রির পরিমাণ মিলিয়ে তৈরি করা আনুমানিক হিসাব বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তুরস্কের পদক্ষেপটি মূলত বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য, বাজার স্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় স্বর্ণের চাহিদা সামলানোর বৃহত্তর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার অংশ।