ফ্লাইদুবাই হামলায় ইরানের যোগ মিললে তেহরানে কঠোর সামরিক আঘাতের সরাসরি হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
ফ্লাইদুবাই বিমানে সহকারী চালকের হামলার তদন্তে ইরানের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে, প্রমাণ মিললে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প
ফ্লাইদুবাই হামলায় ইরানের যোগ মিললে তেহরানে কঠোর সামরিক আঘাতের সরাসরি হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাই বিমানে সংঘটিত ভয়াবহ হামলার সঙ্গে ইরানের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত তদন্তকারীদের প্রকাশ্য তথ্য-প্রমাণে ইরানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যকে এখনই প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া সামরিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমানে মাঝআকাশে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় ককপিটে দুই চালকের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে তদন্তে উঠে আসে, সহকারী চালক প্রধান চালককে আক্রমণ করে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বিমানটি হঠাৎ বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যায় এবং একপর্যায়ে জরুরি অবতরণের জন্য সৌদি আরবের তাবুকের দিকে ঘুরে যায়।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রধান চালককে ছুরিকাঘাতের কথা বলা হলেও পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ জানায়, সহকারী চালক ককপিটে থাকা জরুরি কুঠার ব্যবহার করে হামলা করেছিলেন। তদন্তকারীদের মতে, হামলার সময় বিমানটি ভয়াবহভাবে উচ্চতা হারায়। বিভিন্ন উড্ডয়ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিমানটি কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার মিটারেরও বেশি নিচে নেমে যায়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
প্রধান চালক গুরুতর আহত হওয়ার পরও ককপিটের দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন। এতে যাত্রী ও অন্য সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন। বিমানে থাকা আরও দুইজন প্রশিক্ষিত চালকও পরে নিয়ন্ত্রণ নিতে সহায়তা করেন। শেষ পর্যন্ত বিমানটি নিরাপদে তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানে থাকা যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং আহত দুই চালককে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর থেকেই হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, সহকারী চালক উগ্র ইসলামপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তবে এসব দাবির সবগুলোর স্বাধীন প্রমাণ তখনও প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে তদন্তকারীরা হামলাটি একক ব্যক্তির কর্মকাণ্ড, পরিকল্পিত সন্ত্রাসী তৎপরতা, আত্মঘাতী প্রচেষ্টা কিংবা কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছেন।
৩ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানায়। তারা ঘটনাটিকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে জানায়, হামলার উদ্দেশ্য, পূর্বপরিকল্পনা এবং অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। হামলার ঘটনায় আটক সহকারী চালককে সৌদি আরব থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার অতীত, কর্মজীবন, যোগাযোগ ও অনলাইন কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় এসেছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত সহকারী চালক ওমানের নাগরিক ছিলেন এবং অতীতে তার উগ্র মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণে ওমানের একটি বিমান সংস্থায় উড্ডয়ন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তীতে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে কাজ পান। কীভাবে অতীতের এসব বিষয় নতুন নিয়োগের সময় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই ১ অক্টোবর ট্রাম্পকে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন, হামলাকারীর সঙ্গে ইরানের কোনো যোগসূত্র আছে কি না। ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং তিনি যে তথ্য শুনছেন, তাতে ইরানের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি কোনো গোয়েন্দা তথ্য, প্রমাণ বা নির্দিষ্ট সূত্র প্রকাশ করেননি। এরপর ইরান জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তেহরানকে কঠোরভাবে আঘাত করা হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এখানেই মূল তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের সর্বশেষ প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তখন পর্যন্ত ফ্লাইদুবাই হামলায় ইরানের সংশ্লিষ্টতা শনাক্ত করতে পারেননি। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত চলমান এবং হামলার উদ্দেশ্যও আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ ট্রাম্পের বক্তব্যের ভিত্তি হিসেবে সম্ভাব্য গোয়েন্দা তথ্য থাকতে পারে, কিন্তু জনসমক্ষে প্রকাশিত প্রমাণের ভিত্তিতে ইরানকে এই হামলার জন্য দায়ী বলা এখনো সম্ভব নয়।
আরও সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, তদন্তের কেন্দ্র এখনো অভিযুক্ত সহকারী চালকের ব্যক্তিগত ইতিহাস, উগ্রপন্থী মতাদর্শ, বিদেশে অবস্থান এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত যাচাইয়ের দিকে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও তার দেশটিতে অবস্থানের সময়কার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের তদন্তকারী সংস্থা হামলার পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে।
ফলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন হলো ফ্লাইদুবাই বিমানে হামলা সত্যিই ঘটেছে, সহকারী চালকের হামলায় প্রধান চালক আহত হয়েছেন, বিমানটি ভয়াবহভাবে উচ্চতা হারিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত যাত্রী ও অন্য চালকদের হস্তক্ষেপে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করছে। কিন্তু ইরান এই হামলার নির্দেশ দিয়েছে বা এতে সরাসরি জড়িত ছিল এমন প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তাই ট্রাম্পের সামরিক হুঁশিয়ারি সত্য হলেও, তাঁর উত্থাপিত ইরান-যোগের দাবি এখনো তদন্তাধীন এবং নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না।