ঘড়ি বদলের নিয়ম বন্ধে রিপাবলিকানদের চাপ বাড়ালেন ট্রাম্প, সিনেটে বিল পাসে টানাপোড়েন
ঘড়ি বদল বন্ধে ট্রাম্পের চাপ, রিপাবলিকান সিনেটর টম কটনের বিরোধিতায় আটকে আছে বছরজুড়ে একই সময় রাখার প্রস্তাব, বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ ।
ঘড়ি বদলের নিয়ম বন্ধে রিপাবলিকানদের চাপ বাড়ালেন ট্রাম্প, সিনেটে বিল পাসে টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা করে এগিয়ে-পেছিয়ে দেওয়ার দীর্ঘদিনের নিয়ম বন্ধ করতে আবারও জোরালো চাপ সৃষ্টি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাঁর সমর্থিত প্রস্তাবটি প্রতিনিধি পরিষদে বড় ব্যবধানে পাস হলেও এখনো সিনেটে আটকে আছে। বিশেষ করে রিপাবলিকান সিনেটর টম কটনের বিরোধিতা এবং সিনেটের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রস্তাবটির ভবিষ্যৎকে জটিল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের চাপ আরও প্রকাশ্য হয়েছে। ৩ অক্টোবর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটনকে প্রস্তাবটি আটকে রাখার জন্য দায়ী করেন এবং আরকানসাসের বাসিন্দাদের তাঁর সিনেটরের ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান। ট্রাম্প এমন একটি ফোন নম্বরও প্রকাশ করেন, যেটিকে তিনি কটনের ব্যক্তিগত নম্বর বলে দাবি করেন। পরে বার্তাটিতে সরাসরি জনগণকে কটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রস্তাবটির পক্ষে অবস্থান নিতে বলেন। তবে রয়টার্স ওই নম্বরে যোগাযোগ করে এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় বার্তা পায়নি, যা নিশ্চিত করে যে নম্বরটি কটনেরই। ফলে নম্বরটির মালিকানা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো বছরজুড়ে গ্রীষ্মকালীন সময় কার্যকর করা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ এলাকায় বসন্তে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয় এবং শরতে আবার এক ঘণ্টা পেছানো হয়। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে এই দুই দফা পরিবর্তনের প্রয়োজন থাকবে না। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঞ্চলে একইভাবে প্রযোজ্য হবে না। যেসব অঙ্গরাজ্য ইতোমধ্যে সারা বছর প্রমিত সময় অনুসরণ করে, তাদের সেই ব্যবস্থা বজায় রাখার সুযোগও প্রস্তাবে রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবটির আইনগত অগ্রগতি ইতোমধ্যে হয়েছে। ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ৩০৮-১১৭ ভোটে সূর্যালোক সুরক্ষা আইন পাস করে। ভোটে বিপুলসংখ্যক রিপাবলিকান সদস্যের পাশাপাশি ডেমোক্র্যাট সদস্যদেরও উল্লেখযোগ্য সমর্থন ছিল। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল একটি দলের অবস্থান নয়; দুই দলের মধ্যেই এর পক্ষে ও বিপক্ষে মত রয়েছে। কিন্তু প্রতিনিধি পরিষদে সাফল্যের পরও সিনেটে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত হয়নি।
সিনেটে বিলটি পাস করতে ৬০ ভোট প্রয়োজন হতে পারে। জুলাইয়ে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবটি প্রয়োজনীয় সমর্থন পাবে কি না তা তখনও পরিষ্কার ছিল না। এরপরও ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে চাপ বাড়িয়েছেন। ২ অক্টোবরও তিনি সিনেটকে দ্রুত ভোট নেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু সিনেট অধিবেশন শেষ করে সদস্যরা ওয়াশিংটন ছেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিলটি নিয়ে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
টম কটনের আপত্তির প্রধান কারণ শীতকালের সকালের অন্ধকার। তাঁর যুক্তি, সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চালু থাকলে শীতের সকালে সূর্যোদয় আরও দেরিতে হবে। এতে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় অন্ধকার থাকতে পারে এবং ভোরে কাজে বের হওয়া মানুষ, কৃষক ও নির্মাণশ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। কটন এর আগে যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র অতীতেও সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চালু করেছিল এবং পরে জনগণের অসন্তোষের কারণে তা বাতিল করা হয়।
ইতিহাসও কটনের যুক্তিকে কিছুটা সমর্থন করে। ১৯৭৪ সালে জ্বালানি সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চালু করেছিল। কিন্তু এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সেই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। শীতকালে সূর্যোদয় দেরিতে হওয়ায় অন্ধকারে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা বর্তমান বিতর্কেও বারবার উঠে আসছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলছেন, সন্ধ্যায় বেশি আলো থাকলে কর্মজীবী মানুষ কাজের পর বাইরে সময় কাটাতে পারবেন। খেলাধুলা, কৃষিকাজ, বিনোদন এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও এর সুবিধা হতে পারে। ট্রাম্প বিশেষভাবে বিকেলের অতিরিক্ত আলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি খেলাধুলার বিভিন্ন সংগঠন ও কৃষকদের স্বার্থের কথাও তুলে ধরেছেন। তবে এসব সুবিধা নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক প্রমাণ একমুখী নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন বন্ধ করা এবং সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চালু করা দুটি আলাদা নীতিগত সিদ্ধান্ত।
তথ্য যাচাইয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, অধিকাংশ মানুষ বিকেলের বেশি সূর্যালোক চান এবং ঘড়ি বদলানো বন্ধ করতে চান। ঘড়ি বছরে দুবার বদলানোর বিরোধিতা সত্যিই ব্যাপক। ২০২২ সালের একটি জরিপে ২১ শতাংশ মানুষ বর্তমান ব্যবস্থা বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন, আর ৪৬ শতাংশ সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় এবং ৩৩ শতাংশ সারা বছর প্রমিত সময়ের পক্ষে ছিলেন। অর্থাৎ ঘড়ি বদল বন্ধের প্রতি জনসমর্থন রয়েছে, কিন্তু কোন সময়টি সারা বছর রাখা উচিত—এ বিষয়ে জনগণ একমত নন।
আরেকটি প্রচলিত দাবিও পুরোপুরি সঠিক নয়। সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় চালু করলে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়বে না এবং সূর্যের আলোও তৈরি হবে না। কেবল সূর্যালোক পাওয়ার সময়টি সকাল থেকে সন্ধ্যার দিকে এক ঘণ্টা সরবে। ফলে শীতকালে সন্ধ্যা কিছুটা উজ্জ্বল হলেও সকাল আরও অন্ধকার হবে। এ কারণেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই ট্রাম্পের চাপ রাজনৈতিকভাবে জোরালো হলেও প্রস্তাবটি এখনো আইনে পরিণত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছায়নি। প্রতিনিধি পরিষদের বড় জয়কে সিনেটে পুনরাবৃত্তি করতে হলে রিপাবলিকানদের মধ্যকার মতবিরোধ দূর করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ভোট নিশ্চিত করতে হবে। সিনেটর জন কেনেডিসহ কয়েকজন রিপাবলিকান ইতোমধ্যে প্রস্তাবটির সম্ভাবনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। ফলে ট্রাম্পের প্রকাশ্য চাপের পরও নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বিলটি এগিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুবার ঘড়ি বদলের ব্যবস্থা বাতিলের উদ্যোগ সত্য এবং প্রতিনিধি পরিষদে তা পাসও হয়েছে। তবে এটি এখনো আইন হয়নি। ট্রাম্পের চাপও বাস্তব এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা রিপাবলিকান দলের ভেতরের প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নিয়েছে। মূল বিরোধটি এখন ঘড়ি বদল বন্ধ করা উচিত কি না, তার চেয়ে বেশি ঘড়ি বন্ধ করলে সারা বছর কোন সময় কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে। সিনেটে সেই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটির ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।