ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় নতুন সামরিক ঘাঁটির ইঙ্গিত দিলেন হেগসেথ

ভেনেজুয়েলায় ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা বলেননি হেগসেথ তবে ইউরোপের সেনা সরিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা স্পষ্ট করেছেন

ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় নতুন সামরিক ঘাঁটির ইঙ্গিত দিলেন হেগসেথ

ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় নতুন সামরিক ঘাঁটির ইঙ্গিত দিলেন হেগসেথ


হেগসেথের সর্বশেষ বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমেরিকার পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব ও আধিপত্য ধরে রাখতে এবং আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া ঠেকাতে দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলায় কোনো সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলাকে তিনি সমর্থন করেন কি না। জবাবে তিনি ভেনেজুয়েলায় ঘাঁটি স্থাপনের নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলেননি। বরং ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দায়িত্ব কিছুটা কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নিজ দেশের নতুন ঘাঁটিতে অথবা পশ্চিম গোলার্ধের অন্য কোনো সামরিক অবস্থানে সক্ষমতা সরানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

হেগসেথ বলেন, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক উপস্থিতি ও কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা ও পানামার মতো দেশগুলোর সঙ্গেও সামরিক সহযোগিতা রয়েছে বা নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হেগসেথের বক্তব্যকে শুধু ভেনেজুয়েলাকেন্দ্রিক হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিরক্ষা নীতিতে গোটা পশ্চিম গোলার্ধকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চলতি বছরের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও কোরীয় উপদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব বেশি নিতে হবে। একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে কানাডা, মেক্সিকোসহ অন্যান্য অংশীদার দেশকে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক সন্ত্রাস দমন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় আরও বেশি ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

অর্থাৎ, হেগসেথের সাম্প্রতিক বক্তব্য হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘোষণা নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রতিরক্ষা পুনর্বিন্যাসের অংশ। ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রচলিত প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিম গোলার্ধে মাদক চোরাচালান, আন্তঃদেশীয় অপরাধী সংগঠন, অবৈধ অভিবাসন এবং বিদেশি শক্তির প্রভাবকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। 

হেগসেথ গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভার্জিনিয়ার কোয়ান্টিকোতে সামরিক বাহিনীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যেও নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে সেই ঘাঁটিটি ভেনেজুয়েলা বা দক্ষিণ আমেরিকায় নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে ঘাঁটির জন্য নিজেদের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত ঘাঁটিতে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার সেনাসদস্য রাখার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। 

এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হেগসেথের নতুন ঘাঁটির ঘোষণা এবং ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য ঘাঁটির প্রশ্ন দুটি আলাদা বিষয়। নতুন মার্কিন ঘাঁটি দেশের অভ্যন্তরে নির্মাণের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলায় কোনো নতুন স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

হেগসেথের পরিকল্পিত নতুন অভ্যন্তরীণ ঘাঁটিটি কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বড় নতুন সামরিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, ঘাঁটিটি বড় আকারের জমির ওপর নির্মাণ করা হবে এবং সেখানে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন, আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকবে। এই ঘাঁটির উদ্দেশ্য শুধু সেনাদের থাকার জায়গা তৈরি করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযান ও দ্রুত শক্তি মোতায়েনের জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্র তৈরি করা। 

এর সঙ্গে ইউরোপ থেকে সেনা বা সামরিক সক্ষমতা সরানোর বিষয়টিও যুক্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রচলিত প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। হেগসেথ এর আগে স্পষ্ট করে বলেছেন, ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তায় বেশি দায়িত্ব নিলে যুক্তরাষ্ট্র অন্য অঞ্চলে নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহারের জন্য বেশি সুযোগ পাবে। 

দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার আরেকটি বড় কারণ মাদক চোরাচালান। হেগসেথ বারবার মাদক পাচারকারী সংগঠনগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম গোলার্ধের অন্যতম বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি এসব সংগঠনকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন লাতিন আমেরিকান দেশের সঙ্গে মাদকবিরোধী সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য একটি বহুপক্ষীয় জোটও গঠন করেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষের দাবি, পশ্চিম গোলার্ধে মাদকবিরোধী সামরিক অভিযানের ফলে সমুদ্রপথে মাদক পরিবহনের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগস্টে হেগসেথ পানামায় অংশীদার দেশগুলোর প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার কথা বলেন। একই ধারাবাহিকতায় কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পানামা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করা হচ্ছে। 

ভেনেজুয়েলাও এই নতুন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। হেগসেথ এর আগে ভেনেজুয়েলার মাটিতে মাদক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন এবং দেশটির সরকারের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। 

এর ফলে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ভেনেজুয়েলায় স্থায়ী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা হয়েছে এমন প্রমাণ নেই। বরং হেগসেথের বক্তব্যে পশ্চিম গোলার্ধের বিভিন্ন অংশীদার দেশে সামরিক সক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে পশ্চিম গোলার্ধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে পশ্চিম গোলার্ধে অবৈধ অভিবাসন, মাদক সন্ত্রাস এবং বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব মোকাবিলা করতে চায়। পানামা খাল, গ্রিনল্যান্ড ও মেক্সিকো সীমান্তসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের নিরাপত্তাকে এই নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

বিশ্লেষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন হলো, ইউরোপ থেকে সরানো মার্কিন সামরিক সক্ষমতার কতটা পশ্চিম গোলার্ধে যাবে এবং তার কতটা নিজ দেশের নতুন ঘাঁটিতে রাখা হবে। হেগসেথ এখনো এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সেনাসংখ্যা বা দেশভিত্তিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। ফলে ভেনেজুয়েলায় নির্দিষ্ট ঘাঁটি নির্মাণের খবর হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপন করা অতিরঞ্জিত হবে।

তবে সামগ্রিক চিত্রে বড় পরিবর্তন স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে মিত্রদের আরও দায়িত্ব নিতে বলছে, একই সময়ে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় সামরিক অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে এবং মাদক পাচারকারী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি জোরদার করছে। ভেনেজুয়েলা এই পরিবর্তিত কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, এখন পর্যন্ত দেশটিতে স্থায়ী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হয়নি।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর