স্কুলফেরত ফিলিস্তিনি শিশুর ভয়, সেনাদের হাতে মারধরের পর স্কুলে ফিরতেও এখন আতঙ্ক

স্কুল থেকে ফেরার পথে সেনাদের ভয়ে খুঁটির আড়ালে লুকিয়েছিল শিশু, পরে মারধরের শিকার হয়ে বলছে, আবার স্কুলে ফিরতে ভয় লাগে

স্কুলফেরত ফিলিস্তিনি শিশুর ভয়, সেনাদের হাতে মারধরের পর স্কুলে ফিরতেও এখন আতঙ্ক

স্কুলফেরত ফিলিস্তিনি শিশুর ভয়, সেনাদের হাতে মারধরের পর স্কুলে ফিরতেও এখন আতঙ্ক


ফিলিস্তিনের দখলকৃত পশ্চিম তীরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটি শিশুর খুঁটির আড়ালে লুকিয়ে থাকার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে দেখা যায়, স্কুলব্যাগ কাঁধে থাকা ছোট্ট শিশুটি রাস্তার পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটির শক্ত কংক্রিটের ভিত্তির আড়ালে শরীরের বড় অংশ লুকিয়ে রেখেছে। কাছেই একটি সামরিক যান চলাচল করছে। ছবিটি প্রথমদিকে শুধু একটি মুহূর্তের ভয়কে তুলে ধরেছিল। কিন্তু পরে শিশুটির সঙ্গে কথা বলার পর ঘটনাটি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। 

তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ছবিটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়লেও ঘটনাটি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পশ্চিম তীরের সালফিত এলাকার আল জাওয়িয়া শহরে ঘটে। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি সেনারা ওই এলাকায় অভিযান চালানোর সময় স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল শিশুটি। তখন সে সামরিক টহল থেকে নিজেকে আড়াল করতে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির কংক্রিটের ভিত্তির পেছনে আশ্রয় নেয়। ছবিটির মূল উৎস বা ছবি তোলা ব্যক্তির পরিচয় তখন নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে ছবিটি ঠিক কোন মুহূর্তে এবং কোন ব্যক্তি তুলেছিলেন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। 

ছবিটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, যে বয়সে একটি শিশুর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বই, বন্ধু, খেলাধুলা কিংবা পরিবারের কথা ভাবার কথা, সেই বয়সে তাকে কেন সশস্ত্র সেনাদের চোখ এড়িয়ে চলার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ছবিতে শিশুটির স্কুলব্যাগটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। কারণ সেটিই মনে করিয়ে দেয়, ঘটনাটি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা একজন যোদ্ধাকে নিয়ে নয়, বরং স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা একটি শিশুকে ঘিরে। 

এরপর ৩ অক্টোবর আল জাজিরা শিশুটির সঙ্গে কথা বলে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনারা শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে দেখতে পায় এবং তাকে মারধর করে। শিশুটি এখন জানিয়েছে, সে আবার স্কুলে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। অর্থাৎ কয়েক দিন আগে যে ছবি শুধু একটি শিশুর আতঙ্কের মুহূর্ত দেখিয়েছিল, পরবর্তী সাক্ষাৎকারে সেই ভয় বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে মারধরের ঘটনাটি শিশুটির বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো আলাদা প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই সংবাদগতভাবে এটিকে শিশুটির বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করাই সবচেয়ে সতর্ক পদ্ধতি। 

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশুটির স্কুলে ফেরার ভয়। শিক্ষা একটি শিশুর স্বাভাবিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় চলমান সামরিক অভিযান, চলাচলে বাধা, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক শিশুর জন্য স্কুলে যাওয়া এবং বাড়ি ফেরাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থার সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে শিক্ষা-সম্পর্কিত অন্তত ২২৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২০ হাজার ৪৫০ জন শিক্ষার্থী এবং ৮৫৯ জন শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। 

ওই সংস্থার হিসাবে, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় জুন থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে অন্তত ১০ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। একই সময়ে বছরের শুরু থেকে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং প্রশাসনিক উচ্ছেদ বা বাড়িঘর ধ্বংসের কারণে এক হাজার ৭০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এসব পরিস্থিতি শুধু একটি শিশুকে একটি নির্দিষ্ট দিনে স্কুলে যেতে বাধা দেয় না, বরং তার দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং মানসিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। 

শিশুদের ওপর এই ধরনের পরিস্থিতির মানসিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থার এপ্রিলের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও ভয়ভীতির কারণে শিশুদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা, আচরণগত পরিবর্তন এবং উদ্বেগের মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিরাপত্তাহীনতা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে দেড় লাখের বেশি শিশু নিরাপদ ও নিয়মিত শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধার মুখে রয়েছে। 

শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিস্তৃত চিত্রও উদ্বেগজনক। একই প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১৩ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং ১৩৯ জনের বেশি আহত হয়েছে। আহতদের বড় অংশ ছিল ছেলে শিশু। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একই সময় প্রায় ৩৫০ ফিলিস্তিনি শিশু সামরিক আটক ব্যবস্থার মধ্যে ছিল এবং তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই প্রশাসনিক আটকাদেশ জারি করা হয়েছিল। 

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক পর্যবেক্ষণেও পশ্চিম তীরে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের সময় শিশুদের নিহত ও আহত হওয়ার বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার দায়, পরিস্থিতি এবং সামরিক বাহিনীর বক্তব্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ কারণেই কোনো ছবি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে একা পূর্ণ ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। 

এই শিশুটির ছবির ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। ছবিটি সত্যিই একজন স্কুলফেরত ফিলিস্তিনি শিশুকে একটি সামরিক যান থেকে আড়াল হতে দেখা যাচ্ছে এবং ছবিটির স্থান হিসেবে আল জাওয়িয়া, সালফিতের কথা একাধিক প্রতিবেদনে এসেছে। কিন্তু ছবিটি নিজে শিশুটিকে মারধরের দৃশ্য দেখায় না। মারধরের তথ্য এসেছে পরবর্তী সাক্ষাৎকারে শিশুটির বক্তব্য থেকে। ফলে ছবি এবং পরবর্তী ঘটনার মধ্যে সম্পর্কটি সংবাদ প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলেও, ছবিটিকে মারধরের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে দেখানো সঠিক হবে না। 

এ ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বিষয় হলো শিশুটির বয়সের তুলনায় তার ভয়টির গভীরতা। স্কুলব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় একটি শিশুর নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা পাওয়ার কথা। কিন্তু ওই মুহূর্তে সে নিজের শরীরকে একটি কংক্রিটের খুঁটির আড়ালে লুকিয়ে রাখে। পরে সে যদি সত্যিই মারধরের শিকার হয়ে থাকে এবং সেই অভিজ্ঞতার কারণে স্কুলে ফিরতে ভয় পায়, তাহলে ঘটনাটি শুধু কয়েক মিনিটের শারীরিক নির্যাতনের বিষয় থাকে না। এটি তার শিক্ষা, নিরাপত্তাবোধ এবং স্বাভাবিক শৈশবের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতিতে স্কুলপথের নিরাপত্তা তাই বড় মানবিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। শিশুদের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ শুধু বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার পথ অনিরাপদ হয়ে পড়া, সামরিক অভিযান, চলাচলে বাধা, সহিংসতা এবং বাস্তুচ্যুতিও শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত করে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থার তথ্য বলছে, চলমান নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু শিশুর স্কুলে পৌঁছানো এবং নিয়মিত শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। 

সেপ্টেম্বরের ছবিটি তাই শুধু একটি শিশুর লুকিয়ে থাকার ছবি নয়। এটি পশ্চিম তীরে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে চলমান উদ্বেগের একটি প্রতীকী দৃশ্য হয়ে উঠেছে। তবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ছবির আবেগের পাশাপাশি যাচাই করা তথ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আল জাওয়িয়ায় স্কুল থেকে ফেরার সময় শিশুটির লুকিয়ে থাকার ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পরবর্তী সাক্ষাৎকারে শিশুটি সেনাদের হাতে মারধরের কথা বলেছে ও স্কুলে ফেরার ভয় প্রকাশ করেছে। কিন্তু তার নাম, বয়স, আঘাতের চিকিৎসা এবং ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রত্যক্ষদর্শীদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য অতিরিক্ত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই এসব বিষয়ে অনুমান না করাই তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর