অর্ধেক সেনা প্রত্যাহার: ক্ষমতার ভারসাম্য না আন্তর্জাতিক চাপের প্রতিফলন?

সেনাবাহিনীর ৫০ শতাংশ সদস্যকে মাঠ থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য যেমন প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ, তেমনি রাজনৈতিক বার্তাও বটে। এটি কেবল বাহিনীর প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত বা বিশ্রামমূলক পদক্ষেপ নয় — বরং দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক চাপ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির জটিল মিশ্রণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

PostImage

অর্ধেক সেনা প্রত্যাহার: ক্ষমতার ভারসাম্য না আন্তর্জাতিক চাপের প্রতিফলন?


১ নভেম্বর আকস্মিক এক বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তিন বাহিনীর প্রধানরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, “এটি ছিল নির্বাচনকালীন পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ।” তবে রাজনৈতিক মহলে এবং প্রশাসনিক অভ্যন্তরে এই সাক্ষাৎকে ঘিরে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

এর মাত্র চার দিন পর, ৫ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনরত সেনা সদস্যদের ৫০ শতাংশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। প্রজ্ঞাপনে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়—“বাহিনীর সদস্যদের বিশ্রাম ও নির্বাচনী প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।”

তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মধ্যে সেনা উপস্থিতি কমানোকে অনেকেই “ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের ইঙ্গিত” হিসেবে দেখছেন।

সেনাবাহিনীর অবস্থান ও অন্তর্দ্বন্দ্ব

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৫ আগস্টের সংকটোত্তর যে কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কিন্তু গত ১৫ মাসে সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা, প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের মাত্রা এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার কারণে বাহিনীর ভেতরে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি এক সিনিয়র সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আইন প্রণয়ন করে চাকরিচ্যুত করার ঘটনাকে বাহিনীর সদস্যরা “অভূতপূর্ব ও অস্বস্তিকর নজির” হিসেবে দেখছেন। সূত্র বলছে, এই সিদ্ধান্তগুলো সেনাবাহিনীর সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সেনা হেফাজতে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হয় এবং তাকে ক্যান্টনমেন্টের সাব-জেলে পাঠানো হয়।

অভ্যন্তরীণ মহলের একাংশ মনে করছে, নির্বাহী বিভাগের সাথে সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে “ইউনিফর্ম থাকলেই নিরাপদ থাকা যাবে” — এই ধারণা আর নির্ভরযোগ্য নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত

রাজনীতি বিশ্লেষক এ. রহমান মনে করেন, সেনা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক বা প্রশিক্ষণজনিত নয়; বরং এর পেছনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “জুলাই-অগাস্টে আমরা দেখেছি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেনাবাহিনী তৎকালীন সরকারের নির্দেশ অমান্য করে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিল। এখন কি আবার কোনো বহিরাগত চাপের প্রভাবে মাঠ থেকে অর্ধেক সেনা প্রত্যাহার করা হচ্ছে? এটি বোঝার জন্য আগামী কয়েকদিনের রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।”

ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা?

সরকারি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উদ্বেগ এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ রক্ষা করা। সেনাবাহিনীর অতিসক্রিয় ভূমিকা কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট করছিল, তাই সীমিত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে নির্বাচনকালীন প্রস্তুতিতে মনোযোগী করা হচ্ছে — এমনটিই সরকারিভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে “নিরাপত্তা শূন্যতা” তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।



সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর