যে স্মৃতি আওয়ামী লীগ আমলে কারাগারে ছিলেন, আজ তাঁরই মামলা কি বিএনপির দরজায় প্রশ্ন তুলছে?
চার মাস কারাভোগ, সর্বোচ্চ আদালতে জামিন, সাইবার হয়রানির পাল্টা মামলা—সোনিয়া আক্তার স্মৃতির ঘটনাকে ঘিরে বিএনপির তৃণমূল নেতৃত্বের সুরক্ষা ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন
যে স্মৃতি আওয়ামী লীগ আমলে কারাগারে ছিলেন, আজ তাঁরই মামলা কি বিএনপির দরজায় প্রশ্ন তুলছে?
একজন রাজনৈতিক কর্মী।
একসময় বিরোধী দলের রাজনীতির কারণে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাস। চার মাস জেল খেটে উচ্চ আদালতের লড়াইয়ে জামিন। পরে আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির অভিযোগে নিজেই সাইবার আইনে মামলা করেছেন।
এই দীর্ঘ ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে রাজবাড়ীর বিএনপি নেত্রী সোনিয়া আক্তার স্মৃতি।
তাঁর ঘটনা এখন শুধু একজন নেত্রীর ব্যক্তিগত মামলা-মোকদ্দমার ইতিহাস নয়। এটি সামনে আনছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—যারা বিএনপির সবচেয়ে কঠিন সময়ে মাঠে ছিলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁদের মামলা, নিরাপত্তা ও সাংগঠনিক অবস্থানের বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে দল?
২০২২: ফেসবুক পোস্ট থেকে গ্রেপ্তার
২০২২ সালের ৩১ আগস্ট নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যের সমালোচনা করে একটি পোস্ট দেন সোনিয়া আক্তার স্মৃতি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সামসুল আরেফিন চৌধুরী ওই পোস্টকে আপত্তিকর ও প্রধানমন্ত্রীর সুনাম ক্ষুণ্নকারী দাবি করে রাজবাড়ী সদর থানায় অভিযোগ করেন।
পরে অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়।
২০২২ সালের ৫ অক্টোবর রাতে রাজবাড়ী শহরের বেড়াডাঙ্গার বাসা থেকে স্মৃতিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৫৩ ও ৫০৫ ধারায় মামলা করা হয়েছিল।
তখনকার সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, মামলার বাদী ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা এবং স্মৃতি ছিলেন রাজবাড়ী জেলা মহিলা দলের সদস্য ও রাজবাড়ী ব্লাড ডোনার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
মধ্যরাতের গ্রেপ্তার এবং চার মাসের কারাবাস
স্মৃতিকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর জামিন প্রথমে নিম্ন আদালতে নামঞ্জুর হয়।
পরবর্তীতে হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দিলেও রাষ্ট্রপক্ষ সেই জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করে। ২০২২ সালের ২৮ নভেম্বর আপিল বিভাগ সেই আবেদনের শুনানি দুই মাসের জন্য মুলতবি রাখে; ফলে সে সময় তাঁর জামিন কার্যকর হয়নি এবং তাঁকে কারাগারেই থাকতে হয়।
শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের ১৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন জামিন বহাল রাখে।
এরপর প্রায় চার মাস কারাভোগের পর ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ী কারাগার থেকে মুক্তি পান সোনিয়া আক্তার স্মৃতি। কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।
অর্থাৎ ঘটনাটি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—একজন বিএনপি নেত্রী বাস্তবে গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাগারে থেকেছেন এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের জামিনে মুক্ত হয়েছেন।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি
২০২৪ সালে সোনিয়া আক্তার স্মৃতি নিজেই আরেকটি সাইবার মামলার বাদী হন।
রাজবাড়ীর দাদশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন তিনি। মামলায় অভিযোগ করা হয়, তাঁর একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ফেক আইডি তৈরি, ছবি ও ভিডিও সম্পাদনা এবং মানহানিকর পোস্ট করা হয়েছে।
ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল মামলাটি গ্রহণ করে এবং তদন্তের জন্য ফরিদপুর পিবিআইকে নির্দেশ দেয়। মামলাটি ছিল সাইবার ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর ৩২৯/২০২৪।
অর্থাৎ একজন রাজনৈতিক কর্মী একইসঙ্গে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন—একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও কারাবাস; অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে নিজেই অনলাইন হয়রানির অভিযোগে সাইবার আইনে মামলা করেছেন।
২৩ হাজার ৮৬৫ মামলা প্রত্যাহারের সরকারি তথ্য
এখানেই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে স্মৃতির পুরোনো মামলার যোগসূত্র তৈরি হয়।
২০২৬ সালের ২১ জুন জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী জানান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি জানান, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দলীয় হিসাব অনুযায়ী মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা দায়ের হয়েছিল।
সরকার জানিয়েছে, জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো এফআইআর, চার্জশিট ও সরকারি কৌঁসুলির মতামতসহ মামলার নথি পর্যালোচনা করে সুপারিশ করেছে এবং কেন্দ্রীয় কমিটি তা পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এখন তাই সোনিয়া আক্তার স্মৃতির পুরোনো মামলাকে ঘিরে একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে—
যে মামলা তাঁকে চার মাস কারাগারে রেখেছিল, সেই মামলার বর্তমান আইনি অবস্থান কী?
মামলাটি কি প্রত্যাহার করা হয়েছে?
নাকি এখনও বিচারাধীন?
আর যদি এখনও নিষ্পত্তি না হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের যে সরকারি প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে এই মামলার অবস্থান কোথায়?
স্মৃতি এখন কোথায়?
সময় বদলেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে।
২০২৬ সালের প্রতিবেদনে সোনিয়া আক্তার স্মৃতিকে রাজবাড়ী জেলা মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক এবং জিয়া সাইবার ফোর্সের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছর রাজবাড়ী থেকে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহকারী নেত্রীদের তালিকাতেও তাঁর নাম ছিল।
আর ২০২৬ সালের মার্চে বিএনপির অনলাইনভিত্তিক সংগঠন জিয়া সাইবার ফোর্সের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাঁকে সংগঠনটির সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
অর্থাৎ, যে নারী ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফেসবুক পোস্টের কারণে গ্রেপ্তার হয়ে চার মাস কারাগারে ছিলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও তিনি বিএনপির সাংগঠনিক ও অনলাইন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন।
এখানেই বিএনপির জন্য কঠিন প্রশ্ন
বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাসে হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে—এটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, দলীয় হিসাবের ভিত্তিতেও সংসদে উত্থাপিত হয়েছে।
কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু তার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকে না।
সেই শক্তির বড় অংশ তৈরি করেন মাঠের কর্মীরা।
যারা মামলা মাথায় নিয়ে রাস্তায় থাকেন।
যারা গ্রেপ্তার হন।
যারা কারাগারে যান।
যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের পক্ষে অবস্থান নেন।
যারা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশেও সংগঠনের সঙ্গে থাকেন।
সোনিয়া আক্তার স্মৃতির ঘটনাটি সেই তৃণমূল বাস্তবতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
আওয়ামী লীগ আমলে যাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, যিনি কারাগারে গিয়েছিলেন, যাঁর জামিনের জন্য সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই করতে হয়েছিল—রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁর মতো নেতাকর্মীদের পুরোনো মামলা ও বর্তমান আইনি অবস্থার দায়িত্ব কে নিচ্ছে?
এ প্রশ্ন শুধু স্মৃতির জন্য নয়।
এ প্রশ্ন বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর জন্য।
ক্ষমতার পরিবর্তন কি রাজনৈতিক কর্মীদের বাস্তবতাও বদলেছে?
একটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসে, তখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু সরকার পরিচালনা নয়—নিজেদের রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে, সেটিও।
কারণ বিরোধী দলের সময়ে যে কর্মীকে “দলের যোদ্ধা” বলা হয়, ক্ষমতার সময়ে তাঁর পুরোনো মামলা যদি ফাইলের নিচে পড়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—দল ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় কোথায়?
সোনিয়া আক্তার স্মৃতির ঘটনা সেই প্রশ্নকে দৃশ্যমান করে।
এখানে ব্যক্তিগত আনুগত্য বা দলীয় পরিচয়ের চেয়েও বড় বিষয় হলো আইনের সমান প্রয়োগ, রাজনৈতিক মামলার স্বচ্ছ নিষ্পত্তি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি সাংগঠনিক দায়িত্ব।
‘নিজেদের মানুষই কি নিজেদের কাছে নিরাপদ নয়?’
সোনিয়া আক্তার স্মৃতির ২০২২ সালের ঘটনা ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের।
আজ রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন।
তাই একই ঘটনার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটি এখন আরও কঠিন—
যে বিএনপি নেতাকর্মীরা দীর্ঘ সময় দলকে মাঠে টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁদের মামলা ও নিরাপত্তা নিয়ে যদি যথাযথ সমন্বয় না থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সবচেয়ে আগে কারা পাওয়ার কথা?
কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব?
নাকি সেইসব কর্মী, যারা দীর্ঘদিন মাঠে ছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক স্লোগানে নয়—মামলার নথি, আদালতের আদেশ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই পাওয়া যাবে।
সোনিয়া আক্তার স্মৃতির ঘটনা তাই বিএনপির তৃণমূল রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব উদাহরণ হয়ে আছে।
একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অভিযোগে তিনি কারাগারে গিয়েছিলেন। আজ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় বিএনপির সঙ্গেই।
রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে।
কিন্তু তাঁর মতো নেতাকর্মীদের পুরোনো মামলা, আইনি নিরাপত্তা এবং সাংগঠনিক মর্যাদার প্রশ্নটি এখনও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
CSB NEWS USA
International Desk