চট্টগ্রামে শিশু হত্যায় দীর্ঘ ২১ বছর পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেন নির্দোষ খালাস

বিনা অপরাধে দীর্ঘ ২১ বছর কারাবাসের পর অবশেষে হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেলেন চট্টগ্রামের আমির হোসেন।

চট্টগ্রামে শিশু হত্যায় দীর্ঘ ২১ বছর পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেন নির্দোষ খালাস
চট্টগ্রামে শিশু হত্যায় দীর্ঘ ২১ বছর পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেন নির্দোষ খালাস

চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় বহু আলোচিত শিশু জুলিয়া হত্যা মামলায় দীর্ঘ একুশ বছর পর নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আমির হোসেন। দেশের উচ্চ আদালত হাইকোর্ট এই সংক্রান্ত মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ একুশ বছর কারাভোগের পর পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আসল অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করে পুলিশ নিরীহ ও নির্দোষ এই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করেছিল। রায়ে আদালতের এই মন্তব্য দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চূড়ান্ত গাফিলতিকে আবারও প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।  


আদালতের নথি ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকায় শিশু জুলিয়া নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ওই ঘটনার পর স্থানীয় থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ তদন্তে নেমে মূল অপরাধীকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হলেও তড়িঘড়ি করে আমির হোসেন নামের এই নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। পরবর্তীতে নিম্ন আদালতে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে সমস্ত সাক্ষ্য ও তথ্যের ভুল মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে আসামি আমির হোসেনকে চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। বিচারিক আদালতের সেই আদেশের পর থেকেই আসামি ফাঁসির কনডেম সেলে দিন কাটাচ্ছিলেন।  
পরবর্তীতে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এবং সাজা মওকুফের আর্জি জানিয়ে হাইকোর্টে আপিল করা হয়। উচ্চ আদালতে দীর্ঘদিন ধরে মামলার সমস্ত নথি, জবানবন্দি এবং তদন্ত প্রতিবেদনের সূক্ষ্ম পুনর্বিবেচনা ও শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বারবার দাবি করে আসছিলেন যে, ঘটনার সাথে আমির হোসেনের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রকৃত আসামিকে রেহাই দিতে কিংবা দায় এড়াতে নিরীহ আমিরকে মামলায় ফাঁসিয়েছিলেন।  


অবশেষে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও শুনানির পর হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল ঘোষণা করেন এবং আমির হোসেনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ হিসেবে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। বুধবার প্রকাশ পাওয়া হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয় যে, প্রকৃত আসামীকে রেহাই দিয়ে বা তাকে গ্রেপ্তার না করে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দায়িত্বে অবহেলা করে নিরীহ আমির হোসেনকে আসামি হিসেবে দেখায়। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কারান্তরালে থাকা আমির হোসেনের জীবনের মূল্যবান সময়গুলো এভাবে নষ্ট হওয়ায় আইনজীবীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।  


ন্যায়বিচার দেরিতে হলেও আমির হোসেনের খালাসের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা এবং আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, তদন্তের ত্রুটি ও চরম গাফিলতির কারণে একজন নির্দোষ মানুষ যেভাবে জীবনের দীর্ঘ ২১টি বছর অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটালেন, তার সুষ্ঠু ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত। পাশাপাশি যে সকল তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রকৃত আসামিকে না ধরে কাল্পনিকভাবে নির্দোষ ব্যক্তিকে মামলায় আসামি করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ ২১ বছর জেল খাটার পর এই ঐতিহাসিক রায় প্রকাশের মাধ্যমে দেশের উচ্চ আদালত আইনের শাসন ও সঠিক বিচার নিশ্চিত করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। আমির হোসেনের পরিবার দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে এই রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করলেও জীবনের হারানো সময়গুলো নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল এই ধরনের বিচারিক ভুল ভবিষ্যতে রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল।


প্রতিবেদক

CSB News USA

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…