রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো বৈশ্বিক সহায়তা
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো এবং মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো বৈশ্বিক সহায়তা
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও সমন্বিত ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি ধারাবাহিক বৈঠক ও উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে মিয়ানমারে এমন পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, যেখানে রোহিঙ্গারা নিজেদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পর দেশে ফিরতে আস্থা অনুভব করতে পারেন।
২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব তুলে ধরেন। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে ছিল নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি, মিয়ানমারে বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে ২২ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। বৈঠকে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা চাওয়া হয়।
এর পর জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার প্রধান বারহাম সালেহর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে মানবিক কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণের দিকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং স্থায়ী সমাধানের পথও সেখানেই তৈরি করতে হবে। তিনি রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বাধা, জোরপূর্বক শ্রম এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট এখন দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও সামাজিক চাপের বিষয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরের পাশাপাশি ভাসানচরেও রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন।
জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলোর ২০২৬ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় প্রায় ৭১০ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতা বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি খাদ্য, আশ্রয়, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে, এই অর্থের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কম এবং এটি মূলত জীবন রক্ষাকারী জরুরি প্রয়োজন পূরণের জন্য নির্ধারিত।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে নতুন করে মানুষের পালিয়ে আসা বাংলাদেশের ওপর মানবিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। এর ফলে কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
রোহিঙ্গা সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ, অবকাঠামো ও জনসেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা পরিকল্পনায় তাই শুধু রোহিঙ্গাদের নয়, তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তার আওতায় রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও পৃথক অর্থ বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর পাঁচ দফা প্রস্তাবে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু শিবিরে মানবিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশও অনির্দিষ্টকাল এই দায়িত্ব বহন করতে পারে না। তাই প্রত্যাবাসনের বাস্তবসম্মত পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার, প্রতিবেশী দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাসম্মতি। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে ফেরার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ সালের পরিকল্পনাতেও প্রত্যাবাসনকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের আগে মিয়ানমারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া প্রয়োজন, যাতে ফিরে যাওয়া মানুষ নিরাপত্তা, অধিকার ও মৌলিক সেবা পাওয়ার বিষয়ে আস্থা রাখতে পারেন।
বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়াকে সমর্থন করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গাম্বিয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তকারী ব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহযোগিতা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর মতে, টেকসই প্রত্যাবাসনের সঙ্গে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টি যুক্ত রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে মানব পাচার, মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র, ডিজিটাল প্রতারণা এবং অন্যান্য সীমান্তপারের অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তা এসব ঝুঁকি বাড়াতে পারে—এমন উদ্বেগও তিনি তুলে ধরেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। ২২ সেপ্টেম্বর জুলি বিশপ ও বারহাম সালেহ ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।