পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ৮,৫৪২ জন নিয়োগ, তদন্তে অনিয়মের তথ্য

বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ৮,৫৪২ জন নিয়োগ, এস আলম নিয়ন্ত্রণকালে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পেল বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ৮,৫৪২ জন নিয়োগ, তদন্তে অনিয়মের তথ্য

পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ৮,৫৪২ জন নিয়োগ, তদন্তে অনিয়মের তথ্য


ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকালীন নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটিতে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ পান। তাঁদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৭৯ শতাংশের নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে লিখিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি।

চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংক সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। নির্বাহী পরিচালক আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিটির দায়িত্ব ছিল ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে কর্মীদের চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা। কমিটি সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে আলাদা কোনো সুপারিশ না করে তদন্তে পাওয়া তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মী ছিলেন ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ওই বছরের আগস্ট পর্যন্তই ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগ পেয়েছিলেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের সংখ্যা ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ওই সময়ের মোট নিয়োগের ৮ হাজার ৯৯ জন বা প্রায় ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে শুধু পটিয়া উপজেলারই ৫ হাজার ১৪৮ জন। 

তদন্ত প্রতিবেদনে নিয়োগের একটি ব্যতিক্রমী পদ্ধতির কথাও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জে গ্রুপটির কার্যালয়ে চাকরিপ্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার জন্য আলাদা বাক্স রাখা হতো। এসব বাক্সে ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগড়া’, ‘পুরুষ ক্যাশ-গণ্ডামারা-বাঁশখালী’, ‘সনাতন-জেনারেল’ ও ‘মহিলা-ক্যাশ’সহ বিভিন্ন শ্রেণির লেবেল ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

বর্তমান ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই স্থানগুলো থেকে সংগৃহীত জীবনবৃত্তান্ত প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো এবং তালিকা অনুযায়ী নিয়োগপত্র দেওয়া হতো। বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্তের সময় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া ১০ জনকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে বেছে নিয়ে লিখিত বক্তব্য নেয়। ওই ১০ জনই জানিয়েছেন, তাঁরা জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়ে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন; তাঁদের মধ্যে দুজন জানিয়েছেন, তাঁদের মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি। 

ব্যাংকটির পুরোনো মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, সাধারণভাবে নিয়োগের জন্য অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার বিধান ছিল। এরপর মেধাক্রম অনুযায়ী প্যানেল তৈরির কথা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৭ সালের পর হাজার হাজার নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। 

প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও অনিয়মের তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচের জন্য কোনো প্রকাশ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ৮৪০টি জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়েছিল। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন এবং নির্ধারিত ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন মাত্র ৩৬ জন। পরে যোগ্যতার সীমা কমিয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নম্বর পাওয়া ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। আরও ১২ জনকে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। 

২০২১ সালের ২৫তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অনুসন্ধান। অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়েছিল। ওই ব্যাচে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ পাওয়া ১৫০ জনের মধ্যে ১১০ জন বা প্রায় ৭৩ শতাংশ ছিলেন চট্টগ্রামের। 

বছরভিত্তিক তথ্যেও দ্রুত নিয়োগের চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ৩৬৭ জন, ২০১৮ সালে ১,১১৮ জন, ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ২,৪৬৭ জন, ২০২০ সালে ২,১১০ জন, ২০২১ সালে ৮৬৫ জন এবং ২০২২ সালে ২,১১৯ জন নিয়োগ পান। ২০২৩ সালে ৩৯৭ জন এবং ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আরও ১,৩৯২ জন নিয়োগ দেওয়া হয়। 

এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ শেষ হওয়ার পর এসব নিয়োগের বৈধতা ও কর্মীদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৫,৩৭৩ জনকে পরীক্ষার আওতায় আনা হলেও মাত্র ৪০২ জন অংশ নেন এবং তাঁরা সবাই উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে বহাল রয়েছেন। বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার পর তাঁদের চাকরির অবসান ঘটানো হয়। 

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন পরির্শন শুধু পুরোনো নিয়োগ নয়, পরবর্তী চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই ধরনের নিয়োগ-পরিস্থিতিতে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন ও চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্তে ভিন্ন আচরণের তথ্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন, কর্মীদের নিয়োগ বৈধ বা অবৈধ বিবেচনা করে চাকরিচ্যুত করা হয়নি; বরং নিয়োগের সময় সার্ভিস রুলস অনুসরণ না হওয়ায় তাঁদের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। 

অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে একদিকে এস আলম নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে হাজার হাজার নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার তথ্য এসেছে, অন্যদিকে পরবর্তী মূল্যায়ন ও চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়ার কিছু অংশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে প্রতিবেদনটি ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগব্যবস্থা ও করপোরেট সুশাসন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর