তারেক রহমানের হোটেলের কাছে সন্দেহজনক স্যুটকেস, নিউইয়র্কে ছড়াল বোমা আতঙ্ক
জাতিসংঘ অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কে সন্দেহজনক স্যুটকেস ঘিরে পুলিশি তৎপরতা, পরে সেটি হুমকিমুক্ত ঘোষণা করা হয় এবং সড়ক খুলে দেওয়া হয়।
তারেক রহমানের হোটেলের কাছে সন্দেহজনক স্যুটকেস, নিউইয়র্কে ছড়াল বোমা আতঙ্ক
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অবস্থান করা হোটেলের কাছাকাছি একটি পরিত্যক্ত কালো স্যুটকেসকে ঘিরে মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা দেখা যায়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন চলার সময় ঘটনাটি ঘটায় ওই এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে সাময়িক উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবির সঙ্গে ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। যাচাই করে দেখা গেছে, সেখানে বোমা পাওয়া গেছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং পুলিশ প্রথমে স্যুটকেসটিকে সন্দেহজনক মনে করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় এবং পরে সেটিকে কোনো হুমকি নয় বলে নিশ্চিত করে।
ঘটনাটি ঘটে ম্যানহাটনের পূর্ব তেতাল্লিশতম সড়ক ও তৃতীয় সড়কের সংযোগস্থলের কাছে। স্থানটি ক্রাইসলার ভবনের কাছাকাছি এবং জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকেও কয়েক ব্লকের দূরত্বে। স্থানীয় সময় বিকেল তিনটার কিছু আগে সেখানে একটি কালো স্যুটকেস পড়ে থাকতে দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি প্রশিক্ষিত কুকুর স্যুটকেসটির ভেতরে কিছু শনাক্ত করার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। এরপর জরুরি সেবা ইউনিট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকার কয়েকটি সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। পূর্ব বিয়াল্লিশতম থেকে পূর্ব চুয়াল্লিশতম সড়ক পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় সড়ক থেকে লেক্সিংটন সড়কের মধ্যবর্তী অংশে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশে পুলিশের টেপ টানানো হয় এবং সাধারণ মানুষকে এলাকা এড়িয়ে চলতে বলা হয়। একটি ভবন থেকেও লোকজনকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
তবে তদন্তের পর পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে। নিউইয়র্ক পুলিশ পরে জানায়, সন্দেহজনক বস্তুটি পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সেটিকে আর সন্দেহজনক বা বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যে কর্তৃপক্ষ স্যুটকেসটি পরীক্ষা করে কোনো হুমকি নেই বলে নিশ্চিত করে। ঘটনায় কোনো হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি।
এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির সঙ্গে বাস্তব ঘটনার পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রচারিত পোস্টে বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হোটেলের পাশে দুর্বৃত্তরা স্যুটকেসে বোমা রেখে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশিত পুলিশি তথ্য বা নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদনে স্যুটকেসের ভেতরে বোমা পাওয়া, বোমা পেতে রাখা বা কোনো দুর্বৃত্তের এমন কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং পুলিশি তদন্তের শেষ তথ্য অনুযায়ী, বস্তুটি হুমকিমুক্ত ছিল। তাই ঘটনাটিকে সরাসরি ‘বোমা হামলার ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্যসম্মত নয়।
তারেক রহমান বর্তমানে নিউইয়র্কে রয়েছেন জাতিসংঘের একাশি তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে। ২২ সেপ্টেম্বর তিনি নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর তাকে তার অবস্থানের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর হোটেলে যান এবং সেখানে তার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি রয়েছে।
তারেক রহমানের অবস্থানের হোটেলটি পূর্ব বিয়াল্লিশতম সড়কের কাছে অবস্থিত। সন্দেহজনক স্যুটকেসটি পাওয়া যায় পূর্ব তেতাল্লিশতম সড়ক ও তৃতীয় সড়কের কাছে। ফলে দুটি স্থান একই ম্যানহাটন এলাকার মধ্যে এবং পরস্পরের তুলনামূলক কাছাকাছি হলেও, ঘটনাস্থলটি সরাসরি হোটেলের প্রবেশপথে বা হোটেল ভবনের ভেতরে ছিল—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। হোটেলটির অবস্থান ও ঘটনার স্থান সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়।
ঘটনার সময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন চলছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা ওই সময় শহরে অবস্থান করছেন। এ কারণে জাতিসংঘের আশপাশে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ এর আগেই জানিয়েছিল, জাতিসংঘের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে শহরের পূর্ব অংশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যাতায়াতের সময় বিভিন্ন সড়কে সাময়িক বিধিনিষেধ থাকতে পারে।
নিউইয়র্ক পুলিশের পক্ষ থেকে অধিবেশন শুরুর আগেই জানানো হয়েছিল, প্রায় দুই শত দেশের প্রতিনিধিরা শহরে আসবেন এবং তাদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল, প্রশিক্ষিত কুকুর, জরুরি সেবা ইউনিট, সন্ত্রাসবিরোধী সদস্যসহ বিভিন্ন বিশেষ ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, জাতিসংঘের অধিবেশনকে ঘিরে শহর বা অধিবেশনস্থলের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হুমকির তথ্য তখন তাদের কাছে ছিল না।
এই নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই পূর্ব তেতাল্লিশতম সড়কে পরিত্যক্ত স্যুটকেসটি পাওয়া যাওয়ায় পুলিশ স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটনাটিকে গুরুত্ব দেয়। কোনো পরিত্যক্ত ব্যাগ বা স্যুটকেসের ভেতরে বিপজ্জনক কিছু রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে ঘিরে এলাকা খালি করা এবং সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ রাখা নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। নিউইয়র্ক পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল এ ধরনের সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা ও নিরাপদ করার দায়িত্ব পালন করে।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্যুটকেসটি পরীক্ষা করার পর সেটিকে আর সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। কিছু সময়ের জন্য সড়ক বন্ধ থাকলেও পরে এলাকাটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। কোনো বিস্ফোরণ, বিস্ফোরক উদ্ধার, হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর ঘিরে আগামী কয়েক দিনও ব্যস্ত কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার বৈঠকের কর্মসূচিও রয়েছে।
ফলে মঙ্গলবারের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন নিউইয়র্কে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের নিরাপত্তা ঘিরে আগে থেকেই ব্যাপক সতর্কতা রয়েছে। এ কারণে সন্দেহজনক একটি স্যুটকেস পাওয়া মাত্রই পুলিশ দ্রুত পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং বিশেষজ্ঞ দলকে ডেকে পাঠায়। কিন্তু তদন্ত শেষে সেটি হুমকিমুক্ত হওয়ায় ঘটনাটি কোনো বোমা হামলা বা বিস্ফোরক হামলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।