নিখোঁজ ও নৃশসংতার বলি শত শত শিশু: সারাদেশে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা

দেশে বাড়ছে শিশুদের নিখোঁজ ও সহিংসতার ঘটনা; উদ্ধারকৃতদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় কঠোর আইনি বিচারব্যবস্থা

নিখোঁজ ও নৃশসংতার বলি শত শত শিশু: সারাদেশে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা

নিখোঁজ ও নৃশসংতার বলি শত শত শিশু: সারাদেশে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা


দেশে শিশুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তাদের ওপর সংঘটিত অপরাধ ও হিংস্রতা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির রূপ নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সহিংস ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৫৫ জন শিশু। গণমাধ্যমের খবর পর্যালোচনা করে প্রস্তুত করা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ জন শিশুর লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আরও আতঙ্কজনক তথ্য হলো, নিহত এই শিশুদের মধ্যে ২৬ জনকে নির্মম ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।  


বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সারা দেশে ১৫,৭১৭ জন শিশু নিখোঁজ হিসেবে সাধারণ ডায়েরিভুক্ত বা নথিভুক্ত হয়। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় ১৩,৬৭৯ জন শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ২,০৩৮ জন শিশু এখনও নিখোঁজ রয়ে গেছে। এই হিসাব অনুযায়ী নিখোঁজ শিশুদের ৮৭ শতাংশের বেশি উদ্ধার হলেও বাকি বারো শতাংশ শিশু এখনও অনাবিষ্কৃত। পুলিশের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এই সেবা সহজ হয়েছে এবং ফলে নিখোঁজের নথির সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে শিশুদের নিখোঁজ সংক্রান্ত মোট ১৭,৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬,৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২,৫৫০টি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।  


আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরে সংঘটিত শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শারীরিক নির্যাতন এবং পারিবারিক সহিংসতা। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে ৬৮ জন শিশু এবং পারিবারিক কোন্দল ও সহিংসতার কারণে প্রাণ হারায় ৪৯ জন। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া ২৬ জন শিশুর মধ্যে দুটি ছেলেও ছিল। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টার সময় বাধা দেওয়ায় চার শিশু নিহত হয়, তিন শিশু গুলিতে প্রাণ হারায়, গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যায় দুজন এবং বখাটেদের হামলায় দুজন শিশু প্রাণ হারায়। পাশাপাশি এই সময়ে শিশু আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও লাশ উদ্ধারের আরও ৯৯টি পৃথক ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে সংস্থাটি।  


সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের নৃশংস হত্যার ঘটনাগুলো সর্বস্তরের মানুষকে আলোড়িত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত ৯ সেপ্টেম্বর পাবনা সদর থেকে ১০ বছরের এক স্কুলছাত্র নিখোঁজ হয় এবং সাত দিন পর একটি ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ তদন্তে নিশ্চিত করে যে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের দিন জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০ সেপ্টেম্বর স্কুলে গিয়ে আর ফিরে আসেনি সাত বছরের এক শিশু। পরবর্তীতে তার সহপাঠীর ঘরের মেঝের নিচ থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সহপাঠীর বাবা জড়িত ছিলেন বলে পুলিশ জানায়। একই সঙ্গে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে একযোগে শিশুদের নৃশংসে হত্যার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। যেমন—লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তাঁর তিন কন্যাসন্তানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, রংপুরে এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের পরিবারের সঙ্গে ১২ বছরের শিশু আয়ুশ নিহত হয় এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে এক পরিবারের তিন শিশুকে একই রাতে হত্যা করা হয়।  


পুলিশ সদরদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার বিশ্লেষকরা এসব ঘটনার পেছনের সামাজিক ও প্রশাসনিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। পুলিশের অপরাধ ও অভিযান বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, অভিভাবকের না জানিয়ে চলে যাওয়া, প্রেমে জড়ানো, পড়ালেখার চাপ, অভিমানে ঘর ছাড়া বা অসৎ সঙ্গের প্রভাবে কিশোর-কিশোরীরা ঘর ছাড়তে পারে। তবে ৯ বছরের কম বয়সী শিশুরা প্রধানত রাস্তা বা অপরিচিত জায়গায় হারিয়ে গিয়ে ঠিকানা বলতে না পারায় নিখোঁজ হয়। পুলিশ এখন নিখোঁজদের পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া শিশুদের জন্য পৃথক তালিকা ও দ্রুত ছবি যুক্ত জিডি সেবা চালুর চেষ্টা করছে।  
অন্যদিকে, জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও দেশের শীর্ষ মানবাধিকার কর্মীরা শিশুদের ওপর অব্যাহত সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অভাব, তদন্তে গাফিলতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে দুর্বল সুরক্ষাবেষ্টনী শিশুদের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিচার ব্যবস্থায় অনেক সময় ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার প্রবণতাও বিচার প্রক্রিয়ার প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষয় এবং মানবাধিকার চর্চার অভাব শিশু নির্যাতন বৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিশুরা যাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর কঠোর প্রয়োগ এবং পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর