বিএনপি সরকারের সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা কতটা বদলেছে? অপরাধ কমেছে? উদ্বেগ কাটেনি জননিরাপত্তায়!

বিএনপি সরকারের সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা কতটা বদলেছে, চুরি-ডাকাতি কমলেও হত্যা ও নারী-শিশু নির্যাতনে উদ্বেগ, জননিরাপত্তা নিয়ে উঠছে নতুন প্রশ্ন?

বিএনপি সরকারের সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা কতটা বদলেছে? অপরাধ কমেছে? উদ্বেগ কাটেনি জননিরাপত্তায়!

বিএনপি সরকারের সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা কতটা বদলেছে? অপরাধ কমেছে? উদ্বেগ কাটেনি জননিরাপত্তায়!


বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস পার হওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারের দাবি, আগের তুলনায় পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যানেও চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো কয়েকটি অপরাধের মামলা কমার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

তবে একই সময়ে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের চিত্রও উঠে এসেছে।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘উন্নতি’ বা ‘অবনতি’—একটি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। সরকারি পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পাশাপাশি রাখলে আইনশৃঙ্খলায় মিশ্র চিত্রই স্পষ্ট হয়।

বিএনপি সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে আনে। সরকারের প্রথম ছয় মাসের পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, আগের ছয় মাসের তুলনায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মামলা কমেছে। কিন্তু একই সময়ে হত্যা, দাঙ্গা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলা বেড়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে ছিনতাই বা রবেরির মামলা ছিল ৩২৮টি। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে তা কমে ২৫৬টিতে দাঁড়ায়। ডাকাতির মামলা ৯৬০টি থেকে কমে ৯০৪টি, অপহরণ ৫৬৩টি থেকে ৫১২টি এবং সাধারণ চুরির মামলা ৫ হাজার ১১৩টি থেকে কমে ৪ হাজার ৮০৮টিতে নেমেছে।

কিন্তু হত্যাকাণ্ডের চিত্রে একই ধরনের স্বস্তি নেই। একই প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৭৮৯টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। আগের ছয় মাসে সংখ্যাটি ছিল ১ হাজার ৭৮০টি, যার মধ্যে পুরোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরে দায়ের করা ১৭৮টি মামলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রথম আলোর আগস্টের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রত্যাশিত মাত্রায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সাত ধরনের অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণে ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা পাওয়া যায়। আগের ছয় মাসে একই সাত শ্রেণির মামলা ছিল ২১ হাজার ২২৮টি। অর্থাৎ প্রায় আড়াই শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলা বৃদ্ধির কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিশেষ করে ঢাকার রাস্তায় ছিনতাই ও প্রকাশ্যে অপরাধের কয়েকটি ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে প্রথম আলো জানায়, রাজধানীর সকালের রাস্তায় ছিনতাই এবং অপরাধের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সেপ্টেম্বরে ধানমন্ডিতে অস্ত্রের মুখে ৩৮ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনাও ঘটে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুতর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্য ডেইলি স্টারের ৭ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তেও জননিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেখানে একজন প্রধান শিক্ষকের ছিনতাইয়ের ঘটনায় মৃত্যু এবং ঢাকাগামী বাসে এক যাত্রীকে হত্যার অভিযোগসহ কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। পত্রিকাটি পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলেছে, ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের মামলা কমলেও হত্যা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে রাজধানীতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ১৪ সেপ্টেম্বর ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ রাজধানীর প্রবেশপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো, ব্লক চেক জোরদার এবং অপরাধ সংঘটনের আগেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি নজরদারির নির্দেশ দেন। গোয়েন্দা বিভাগ, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট এবং থানাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, সামগ্রিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের মনোবল ফিরে এসেছে এবং হত্যা, ডাকাতি, অপহরণসহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশি তথ্যের ভিত্তিতে হত্যা, অপহরণ ও নারী নির্যাতনসহ কয়েকটি বড় ধরনের অপরাধ কমার দাবি করেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম ও নজরদারির কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

সরকারের এই দাবির পক্ষে আরেকটি পরিসংখ্যান পাওয়া যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্যে। সেখানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধের সংখ্যা ২৩৭টি বা ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছিল।

তবে সরকারের মধ্যেও স্বীকারোক্তি রয়েছে যে পরিস্থিতি এখনো মানুষের প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আগস্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই বলেন, প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলায় উন্নতি হলেও জনগণের প্রত্যাশার জায়গায় পৌঁছাতে আরও সময় প্রয়োজন।

সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বর্তমান চিত্র হচ্ছে—আইনশৃঙ্খলার কয়েকটি সূচকে উন্নতি ঘটেছে, বিশেষ করে চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের নথিভুক্ত মামলায়। কিন্তু হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা এবং রাজধানীতে আলোচিত সহিংস অপরাধের ঘটনাগুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

তাই বর্তমান বিএনপি সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো শাসনামলের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করে কোনটি ‘শক্ত’ ছিল—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য আরও দীর্ঘ সময়ের একই ধরনের পরিসংখ্যান প্রয়োজন। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, কিছু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি থাকলেও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর