হাসিনার আমলে যাকে ‘জঙ্গি নাটক’ বলা হয়েছিল, এখন সেই জঙ্গিবাদ দমনেই তৎপর প্রশাসন

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে ‘জঙ্গি নাটক’ বলে প্রশ্ন তুলেছিল তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের একটি অংশ। ক্ষমতার পালাবদলের দুই বছর পর এখন সেই জঙ্গিবাদ দমনেই তৎপর বর্তমান প্রশাসন। একদিকে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার, অন্যদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একের পর এক মিছিল—দুই ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

হাসিনার আমলে যাকে ‘জঙ্গি নাটক’ বলা হয়েছিল, এখন সেই জঙ্গিবাদ দমনেই তৎপর প্রশাসন

হাসিনার আমলে যাকে ‘জঙ্গি নাটক’ বলা হয়েছিল, এখন সেই জঙ্গিবাদ দমনেই তৎপর প্রশাসন


বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের একটি অংশ জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রশ্ন তুলেছিল। ২০২৩ সালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আওয়ামী লীগ সরকারের জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে ‘মিলিট্যান্ট ড্রামা’ বা ‘জঙ্গি নাটক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর পর দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ নিয়ে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার তেজগাঁও কলেজের মসজিদ থেকে ২৩ জনকে আটক এবং একই রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে নতুন করে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর তেজগাঁও কলেজের মসজিদে একটি বৈঠক চলার সময় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২৩ জনকে আটক করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সেখানে একটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের বৈঠক হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, সংগঠনগত সম্পৃক্ততা এবং বৈঠকের প্রকৃত উদ্দেশ্য তখনও যাচাই করা হচ্ছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট ও অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের সদস্যরাও যুক্ত হন।

তবে আটক ব্যক্তিদের একজন সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তারা একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন এবং ব্যবসায়িক বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন, তাদের মধ্যে অনেকে আগে একে অপরকে চিনতেন না এবং কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। ফলে পুলিশের সন্দেহ ও আটক করার ঘটনা নিশ্চিত হলেও তাদের জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনো তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে হাতবোমার বিস্ফোরণ, মহাখালী, আগারগাঁও ও মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। পরে কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। শুক্রবার রাত পর্যন্ত ঢাকার অন্তত আটটি স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায় এবং একটি ঘটনায় একজন রিকশাচালক আহত হন। এসব ঘটনার পর রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে এসব বিস্ফোরণের সঙ্গে তেজগাঁও থেকে আটক ২৩ জনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করেনি। ফলে দুটি ঘটনাকে একই সংগঠন বা নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার আগে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা প্রয়োজন। একইভাবে বিস্ফোরণের পেছনে কারা রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং কোনো সংগঠিত গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জঙ্গিবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন অভিযানের সত্যতা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে একাধিকবার প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ২০২৩ সালের আগস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছিলেন, সরকার রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে ‘মিলিট্যান্ট ড্রামা’ তৈরি করছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থান ছিল, দেশে জঙ্গিবাদ একটি বাস্তব নিরাপত্তা হুমকি এবং তা মোকাবিলায় অভিযান প্রয়োজন। ফলে একই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বক্তব্য ছিল পরস্পরবিরোধী।

এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। বিভিন্ন কারাগারে হামলা ও বন্দি পালানোর ঘটনা ঘটে। একই সময় কিছু জঙ্গি ও উগ্রবাদী মামলার আসামি জামিনে মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুলিশ ও বিচারব্যবস্থায় সৃষ্ট অস্থিরতা সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছিল। প্রতিবেদনে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসীমউদ্দিন রাহমানির জামিনে মুক্তির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।

২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জামিনে মুক্ত হওয়া কিছু সন্দেহভাজন জঙ্গি ও উগ্রবাদী পুরোনো নেটওয়ার্কে পুনরায় যোগাযোগ ও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বোমা বা বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোকেও সেই নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে। তবে কোনো ব্যক্তি জামিনে মুক্ত হয়েছেন বলেই তিনি আবার জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে সব জঙ্গি মামলা রাজনৈতিক কারণে পরিচালিত হয়েছিল—এমন সামগ্রিক দাবির ক্ষেত্রেও পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একই সঙ্গে একাধিক ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, মশাল মিছিল, সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, অন্যদিকে জঙ্গি সন্দেহে অভিযান, বিস্ফোরক উদ্ধার, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। এসব ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি ও নিরাপত্তা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক সহিংসতা ও জঙ্গিবাদকে একই বিষয় হিসেবে দেখা নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ বা সহিংসতা ঘটলেই সেটিকে জঙ্গি কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। আবার কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার সন্দেহ তৈরি হলেই তাকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখারও সুযোগ নেই। তাই রাজনৈতিক সহিংসতা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং সংগঠিত জঙ্গি নেটওয়ার্ককে পৃথকভাবে শনাক্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো ‘জঙ্গি নাটক’ বিতর্কও বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে সামনে এসেছে। অতীতে যেসব জঙ্গিবিরোধী অভিযান নিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠেছিল, বর্তমানের ঘটনাগুলো দিয়ে সেসব অভিযানের সবকিছুকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করা যায় না। একইভাবে বর্তমানের প্রতিটি বিস্ফোরণকে অতীতের জঙ্গি নেটওয়ার্কের পুনরুত্থান হিসেবেও ধরে নেওয়া যায় না। প্রতিটি ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং তাদের সঙ্গে আগের কোনো সংগঠনের সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত থেকেই আসতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন তেজগাঁওয়ের আটক ২৩ জনকে ঘিরে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা জঙ্গি সম্পৃক্ততার সন্দেহ কতটা সত্য, তাদের বৈঠকের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তে পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুক্তি পাওয়া সন্দেহভাজন উগ্রবাদীদের কেউ পুরোনো নেটওয়ার্কে ফিরেছে কি না, সেটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। গোয়েন্দা তথ্য, উদ্ধার হওয়া আলামত, তদন্তের ফলাফল, প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং আদালতে উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে কোন ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং এর পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল। কারণ জঙ্গিবাদ একটি বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকি হলে সেটি মোকাবিলা করা যেমন জরুরি, তেমনি সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত না করে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

দুই বছর পর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি, জঙ্গি সন্দেহে আটক এবং রাজধানীর ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো একসঙ্গে নতুন নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একসময় যে জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক পক্ষের কেউ ‘নাটক’ হিসেবে প্রশ্ন তুলেছিলেন, এখন সেই জঙ্গিবাদ নিয়েই প্রশাসনকে আবার মাঠে নামতে হচ্ছে। তবে বর্তমান ঘটনাগুলো পুরোনো বিতর্কের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—দেশে বাস্তব জঙ্গি ঝুঁকি কতটা রয়েছে এবং রাষ্ট্র সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত। এর উত্তর শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর