জুলাই সনদ’ নিয়ে বিতর্ক: ইউনুসের পদক্ষেপে প্রশ্ন, দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড়

“ড. ইউনুস কথার জাদুতে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও, বাস্তবে তিনি জাতিকে একত্রিত না করে বিভাজিত করেছেন। যে মানুষটি সারা দুনিয়াকে টুপি পরিয়েছেন, তিনি আজ নিজ দেশের মানুষকেও টুপি পরিয়েছেন।”

PostImage

জুলাই সনদ’ নিয়ে বিতর্ক: ইউনুসের পদক্ষেপে প্রশ্ন, দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড়


বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে আয়োজিত “জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান” ঘিরে দেশে-বিদেশে তীব্র সমালোচনার ঝড় বইছে। জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ঘোষিত এই সনদ এখন রাজনৈতিক বিভাজনের নতুন ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

১৭ অক্টোবর ঢাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে মোট ২৫টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। তবে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণসংহতি আন্দোলনসহ কয়েকটি বামপন্থি দল সনদে স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকে। তারা অভিযোগ করে, এই উদ্যোগের কোনো “আইনি ভিত্তি বা গণআস্থা” নেই এবং এটি “একটি দলীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে জাতীয় ঐক্যের নামে আড়াল করার প্রচেষ্টা।”

রয়টার্স, দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এবং দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণ না করা দলগুলো সনদটিকে “অস্বচ্ছ, পরামর্শবিহীন ও একক সিদ্ধান্তের ফল” বলে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, যে দলিলটিকে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ঘোষণাপত্র বলা হচ্ছে, সেটিই এখন “নতুন বিভাজনের রূপরেখা” হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাংবাদিক নাজমুস সাকিব ফেসবুকে লিখেছেন,

“ড. ইউনুস কথার জাদুতে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও, বাস্তবে তিনি জাতিকে একত্রিত না করে বিভাজিত করেছেন। যে মানুষটি সারা দুনিয়াকে টুপি পরিয়েছেন, তিনি আজ নিজ দেশের মানুষকেও টুপি পরিয়েছেন।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউনুস অতীতে ছাত্র সমাজ ও এনসিপি নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখলেও, এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে সেই সম্পর্ক ও প্রতিশ্রুতিগুলো উপেক্ষা করছেন।

নিউ এজ–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়, “গ্রামীণ” প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য বিশেষ কর ছাড়, অনুমোদন ও আর্থিক প্রণোদনা বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকারের একাধিক নীতি–নির্ধারণী সূত্র জানায়, এসব সিদ্ধান্তে ড. ইউনুসের ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একাধিক মন্ত্রী ও উপদেষ্টা অভিযোগ করেন, “জাতীয় স্বার্থের আড়ালে একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থরক্ষার নীতি কার্যকর হচ্ছে।”

অনুষ্ঠানের দিন রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবুও ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামে পরিচিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ ঘটে।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, “সরকার একপাক্ষিকভাবে জাতীয় সনদ ঘোষণা করে জনগণের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও মতিঝিলেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, “জুলাই সনদ” যদি সত্যিই জাতীয় ঐক্যের দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তবে এর স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল করিম বলেন,

“জাতীয় ঐক্যের যে দাবি করা হচ্ছে, তা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন সব রাজনৈতিক ও নাগরিক শক্তি এতে সমভাবে যুক্ত হবে। এখন যেভাবে বিষয়টি একপাক্ষিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।”

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, পশ্চিমা কূটনীতিকরা “জুলাই সনদ”-এর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকজন কূটনীতিক ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “অন্তর্বর্তী সরকার যদি জাতীয় ঐক্যের নামে নতুন রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে, তবে তা গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলবে।”

“জুলাই সনদ” একদিকে নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের প্রতিশ্রুতি দিলেও, এর চারপাশে তৈরি হওয়া অসন্তোষ, স্বচ্ছতার প্রশ্ন এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিতর্ক এখন সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

যদি এই সমালোচনা অব্যাহত থাকে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ড. মুহাম্মদ ইউনুসের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি—দুটিই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর