হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনায় তেলের দাম বাড়ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি

হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা ও ইরান সংঘাত তেলের বাজারে ঝুঁকি বাড়িয়েছে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্যস্ফীতি ও পরিবহন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনায় তেলের দাম বাড়ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনায় তেলের দাম বাড়ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি


ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পৌঁছে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও উচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি, পরিবহন, কৃষি ও পণ্যের দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।


হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিও ঝুঁকির মুখে পড়ে।


রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার কথা উঠে এসেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের শুরুতে এক দিনে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করেছে। এটি সংঘাতের কারণে প্রবাহ কমে যাওয়ার পর সর্বোচ্চ দৈনিক প্রবাহের অন্যতম উদাহরণ। অর্থাৎ হরমুজ দিয়ে তেল চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণও রয়েছে।

তবে বাজারের উদ্বেগ শুধু বর্তমানে কত তেল যাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে না। বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে কী হতে পারে, সেটিও হিসাব করছেন। যদি সংঘাত আরও তীব্র হয় এবং জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এই আশঙ্কাই তেলের দামে অতিরিক্ত ঝুঁকির মূল্য যোগ করছে।


সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলারের কাছাকাছি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ ডলারের আশপাশে ছিল। সপ্তাহের হিসাবে উভয় ধরনের তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের পরিস্থিতি, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এই বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে।

তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব প্রথমে দেখা যায় পেট্রোল ও ডিজেলের দামে। এরপর পরিবহন ব্যয় বাড়ে। একটি ট্রাক যখন পণ্য এক শহর থেকে অন্য শহরে নিয়ে যায়, তার জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে খাদ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে।

কৃষিখাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কৃষকের ট্রাক্টর, সেচযন্ত্র, ফসল পরিবহনের যান এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতিতে জ্বালানি প্রয়োজন। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এরপর সেই ব্যয় খাদ্যের বাজারে স্থানান্তরিত হতে পারে।


বিমান পরিবহনও তেলের দামের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়া, পণ্য পরিবহন এবং পর্যটন খাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


জাহাজ পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো যদি নিরাপত্তাজনিত কারণে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, তাহলে সময় ও জ্বালানি ব্যয় উভয়ই বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মোট ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মূল্যস্ফীতি। তেলের দাম বাড়লে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে খরচ বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পণ্য কেনার খরচ বাড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার কমাতে না পারে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।


যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তার জ্বালানি বাজার গভীরভাবে যুক্ত। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়তে পারে।

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডিজেলভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থার কারণে এর প্রভাব শুধু গাড়ির চালকদের ওপর পড়ে না। ট্রাক পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়।


এশিয়ার জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় অর্থনীতিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে তাদের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি বিশ্বব্যাপী তেল সংকট বলা এখনো যথাযথ নয়। কারণ হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রীর দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তেল পরিবহনের পরিমাণ আবার বাড়ছে। তাই বাস্তব সরবরাহ সংকট এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির আশঙ্কা—এই দুই বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

তেলের বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগকারীদের আচরণ। যুদ্ধের পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। যদি কূটনৈতিক সমাধান আসে, হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয় এবং সংঘাত কমে যায়, তাহলে তেলের দাম দ্রুত কমে যেতে পারে। আবার সংঘাত হঠাৎ বাড়লে দাম দ্রুত আরও বাড়তে পারে।


এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতির প্রতিটি পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, একটি জাহাজের ওপর আক্রমণ বা হরমুজ প্রণালিতে নতুন কোনো নিরাপত্তা সতর্কতা তেলের বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা সৃষ্টি করতে পারে।


বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তাই সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি হবে সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ বাণিজ্য নিশ্চিত হওয়া। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ স্থায়ী হতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর