চীনা গাড়ি ঠেকাতে মার্কিন কংগ্রেসে দ্রুত নতুন আইন চায় বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতারা
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা গাড়ি ও প্রযুক্তি ঠেকাতে নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং শিল্প প্রতিযোগিতার যুক্তিতে আইন পাসের চাপ বাড়ছে দ্রুত আরও।
চীনা গাড়ি ঠেকাতে মার্কিন কংগ্রেসে দ্রুত নতুন আইন চায় বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতারা
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির বাজারে চীনা নির্মাতাদের প্রবেশ ঠেকাতে নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে দেশটির বড় গাড়ি নির্মাতাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। বৃহস্পতিবার সংগঠনটি মার্কিন কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, বছরের শেষ হওয়ার আগেই চীনা গাড়ি, গাড়ির সফটওয়্যার এবং সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আইন পাস করা হোক। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আহ্বানের পেছনে শুধু বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও সামনে আনা হয়েছে।
গাড়ি নির্মাতাদের এই জোটে জেনারেল মোটরস, ফোর্ড, টয়োটা, ভক্সওয়াগেন, হুন্দাই, হোন্ডা ও স্টেলান্টিসসহ বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, চীনা নির্মাতারা নিজ দেশের সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকির সুবিধা নিয়ে তুলনামূলক কম দামে সংযুক্ত প্রযুক্তিসম্পন্ন গাড়ি বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একই ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হলে স্থানীয় নির্মাতাদের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো গাড়িতে ব্যবহৃত আধুনিক সংযুক্ত প্রযুক্তি। বর্তমান প্রজন্মের বৈদ্যুতিক ও স্মার্ট গাড়িতে মোবাইল যোগাযোগ, বেতার সংযোগ, অবস্থান নির্ণয়, বিভিন্ন সেন্সর এবং অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকে। মার্কিন গাড়ি শিল্পের প্রতিনিধিরা আশঙ্কা করছেন, চীনা প্রতিষ্ঠানের তৈরি বা নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে এসব গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এখানেই বিষয়টি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা থেকে জাতীয় নিরাপত্তার আলোচনায় চলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, সেমিকন্ডাক্টর ও বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে একাধিক ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন আইন হলে গাড়ি শিল্পও সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন সিনেটের বাণিজ্যবিষয়ক কমিটি জুলাইয়ে চীনা গাড়ির ওপর বিধিনিষেধ আরও শক্ত করার একটি বিল অনুমোদন করেছিল। কিন্তু সেটি এখনো পুরো কংগ্রেসে চূড়ান্তভাবে পাস হয়নি। নতুন করে গাড়ি নির্মাতাদের চাপের ফলে আইনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শুধু সম্পূর্ণ চীনা মালিকানাধীন গাড়ি নিষিদ্ধ করা নয়; গাড়িতে ব্যবহৃত চীনা সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার নিয়েও বিধিনিষেধ আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো গাড়ি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হলেও যদি গুরুত্বপূর্ণ সংযুক্ত প্রযুক্তি চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসে, সেক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে।
এতে অবশ্য মার্কিন গাড়ি শিল্পের মধ্যেই কিছু জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আধুনিক গাড়ি উৎপাদন একটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন দেশের যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, ব্যাটারি প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক উপাদান একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তার নামে খুব বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা দিলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং গাড়ির দামও বাড়তে পারে।
চীনা মালিকানাধীন বা চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের ওপর এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, চীনা প্রতিষ্ঠান গিলি হোল্ডিংয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন পোলেস্টার যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৭ সালের মডেল বছর থেকে গাড়ি বিক্রি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা গাড়ির সরাসরি উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও বিশ্ববাজারে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির শক্ত অবস্থান ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং ইউরোপ, এশিয়া, লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চীনা ব্র্যান্ডের গাড়ি জনপ্রিয় হচ্ছে।
চীনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এমন নিষেধাজ্ঞাকে অন্যায্য বাণিজ্যিক বাধা হিসেবে দেখা হতে পারে। ফলে গাড়ি নিয়ে নতুন আইন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বৃহত্তর প্রযুক্তি ও বাণিজ্য দ্বন্দ্বকেও আরও তীব্র করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখনো একটি প্রস্তাবিত আইন নিয়ে রাজনৈতিক ও শিল্প মহলের চাপ—চীনা গাড়ি যুক্তরাষ্ট্রে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে এমন নয়। কংগ্রেসে আইন পাস, প্রেসিডেন্টের অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের পরই এর পূর্ণ প্রভাব নির্ধারিত হবে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “যুক্তরাষ্ট্রে সব চীনা গাড়ি নিষিদ্ধ” ধরনের সরল দাবি করলে তা বিভ্রান্তিকর হবে। বর্তমান সত্য হলো, বড় মার্কিন গাড়ি নির্মাতারা দ্রুত আইন করার জন্য কংগ্রেসের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।