ফেডের সুদ সিদ্ধান্তে নতুন অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও তেলের দামে বদলাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের হিসাব

মূল্যস্ফীতি কমলে সুদ অপরিবর্তিত রাখার ইঙ্গিত দিলেন ওয়ালার, তবে তেলের দাম বাড়লে আবার সুদ বাড়ানোর ঝুঁকি থাকছে সামনে বাজারে এখনো।

ফেডের সুদ সিদ্ধান্তে নতুন অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও তেলের দামে বদলাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের হিসাব

ফেডের সুদ সিদ্ধান্তে নতুন অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও তেলের দামে বদলাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের হিসাব


যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের সুদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার বৃহস্পতিবার বলেছেন, আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির তথ্য তাঁর সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে। মূল্যস্ফীতি যদি ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুই শতাংশ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে বর্তমান সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে তিনি অবস্থান নিতে পারেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলে সুদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।


ওয়ালারের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সেপ্টেম্বরের ১৫ ও ১৬ তারিখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী বৈঠক হওয়ার কথা। তার আগে ১১ সেপ্টেম্বর আগস্ট মাসের মূল্যস্ফীতির সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হবে। সেই প্রতিবেদনে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক জ্বালানি ব্যয়ের চাপ কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটি বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


ওয়ালার জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক উন্নতি দেখা গেলে বর্তমান নীতি সুদে থাকার পক্ষে তাঁর অবস্থান তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ এখনই সুদ বাড়ানো প্রয়োজন—এমন সিদ্ধান্তে তিনি পৌঁছাননি। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, মূল্যস্ফীতির নতুন উত্থান হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। এই অবস্থান দেখাচ্ছে, ফেডের নীতিনির্ধারকেরা অর্থনীতির দুই বিপরীত ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছেন। একদিকে অতিরিক্ত সুদ বাড়ালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভোক্তা ব্যয় দুর্বল হতে পারে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়। তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবহন, উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বাড়তে পারে। ফলে ফেড যদি দেখতে পায় যে জ্বালানি ব্যয় আবার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি করছে, তাহলে সুদ কমানো বা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।


এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার সরাসরি প্রতিটি পরিবারের জীবনযাত্রার সব খরচ নির্ধারণ করে না, কিন্তু এর প্রভাব অর্থনীতির বহু জায়গায় পড়ে। ব্যাংক ঋণের সুদ, বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ, ব্যবসায়িক ঋণ এবং বড় ধরনের বিনিয়োগের খরচ—সবকিছুর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির প্রভাব থাকে। ফলে সুদ বাড়লে ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হতে পারে এবং মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমিয়ে দিতে পারে।


অন্যদিকে সুদ দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে সঞ্চয়কারীরা কিছু সুবিধা পেতে পারেন। ব্যাংকের আমানত ও কিছু নির্দিষ্ট সঞ্চয়পণ্যে তুলনামূলক ভালো সুদ পাওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু ঋণগ্রহীতাদের জন্য একই সময়ে মাসিক ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে ফেডের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক শুধু ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সাধারণ পরিবার, বাড়ির ক্রেতা এবং ব্যবসায়ীদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।


ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শও সম্প্রতি মূল্যস্ফীতির যথেষ্ট উন্নতি হয়নি বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের পর বাজারে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে সুদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা বেড়ে যায়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের ফলনও কিছুটা ওপরে উঠেছিল। পরে ওয়ালারের তুলনামূলক নরম অবস্থান বাজারে নতুন ভারসাম্য তৈরি করে।


বাজারের হিসাবেও দ্রুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ালারের বক্তব্যের পর সেপ্টেম্বরের বৈঠকে সুদ বাড়ানোর প্রত্যাশা কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা আগামী দিনের মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের তথ্যের দিকে তাকিয়ে আছেন। শুক্রবারের মাসিক কর্মসংস্থান প্রতিবেদনও ফেডের সিদ্ধান্তের আগে গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ফেডের জন্য আরেকটি সমস্যা হলো, অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ থেকে সবসময় একই ধরনের সংকেত পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমবাজারে নিয়োগের গতি আগের তুলনায় দুর্বল হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলেও মূল্যস্ফীতি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পুরোপুরি নেমে আসেনি। ফলে সুদ কমানোর মতো পর্যাপ্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করা কঠিন। আবার অতিরিক্ত কড়াকড়ি নীতি অর্থনীতিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।

তেলের দাম এখানে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তাগুলোর একটি। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট তেলের দাম ৯৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল আরও কমে যায়, তাহলে সরবরাহ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ বাড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফেডের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওয়ালার ৩ সেপ্টেম্বর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর মন্তব্য কোনো গুজব বা বাজারের অনুমান নয়; এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নীতিনির্ধারকের প্রকাশ্য অবস্থান। তবে তাঁর বক্তব্যকে পুরো ফেডের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। সেপ্টেম্বরের বৈঠকে অন্য নীতিনির্ধারকেরাও অর্থনৈতিক তথ্য, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও আর্থিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা করবেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ১১ সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন। সেখানে যদি দাম বাড়ার গতি কমে আসে, তাহলে সুদ অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে যুক্তি শক্তিশালী হতে পারে। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলে সুদ বাড়ানোর সম্ভাবনা আবার জোরালো হবে।

তাই সেপ্টেম্বরের ফেড বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির দিকে নজর রাখা বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সিদ্ধান্তের দরজা দুই দিকেই খোলা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমলে স্বস্তি, আর তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়লে আবার কঠোর নীতির ঝুঁকি—এই দ্বৈত পরিস্থিতিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর