অভিবাসীদের তথ্য না দিলে অঙ্গরাজ্যগুলোর কোটি ডলার সহায়তা বন্ধের হুমকি ট্রাম্প প্রশাসনের

অবৈধভাবে থাকা অভিবাসীদের তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারকে না দিলে কল্যাণ সহায়তা হারানোর ঝুঁকিতে অঙ্গরাজ্যগুলো, নতুন নির্দেশনায় বাড়ল অভিবাসন চাপ।

অভিবাসীদের তথ্য না দিলে অঙ্গরাজ্যগুলোর কোটি ডলার সহায়তা বন্ধের হুমকি ট্রাম্প প্রশাসনের

অভিবাসীদের তথ্য না দিলে অঙ্গরাজ্যগুলোর কোটি ডলার সহায়তা বন্ধের হুমকি ট্রাম্প প্রশাসনের


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এবার দেশটিতে বৈধ অভিবাসন মর্যাদা নেই—এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কে অঙ্গরাজ্যগুলোর কাছে থাকা তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সরবরাহ না করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণমূলক কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিচার বিভাগ। ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিচার বিভাগের আইনগত মতামতে এই অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে নতুন আইনি ও রাজনৈতিক বিরোধের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। 


যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের আইন পরামর্শ দপ্তরের মতামতে বলা হয়েছে, যেসব অঙ্গরাজ্য নির্দিষ্ট দুটি ফেডারেল কল্যাণ কর্মসূচির অর্থ পায়, তাদের অঙ্গরাজ্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে থাকা অবৈধভাবে অবস্থানরত অভিবাসীদের তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানাতে হবে। এর আগে এই ধরনের তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন পরিচালনাকারী সংস্থার মধ্যেই সীমিত ছিল। নতুন ব্যাখ্যায় সেই দায়িত্ব আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। 


বিচার বিভাগের এই ব্যাখ্যার ফলে এমন অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে, যেখানে অভিবাসন আইন প্রয়োগে স্থানীয় প্রশাসন ও ফেডারেল সরকারের মধ্যে সহযোগিতা সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্য এবং শহর দীর্ঘদিন ধরে এমন নীতি অনুসরণ করে আসছে, যেখানে স্থানীয় সরকারি কর্মীদের ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা থাকে। ট্রাম্প প্রশাসন এসব নীতির বিরোধিতা করে আসছে।


নতুন আইনগত মতামতটি সরাসরি কোনো নতুন আইন নয়। এটি বিচার বিভাগের আইন পরামর্শ দপ্তরের একটি বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক ব্যাখ্যা, যা ফেডারেল সরকারের সংস্থাগুলোর ওপর কার্যকর। তবে অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আদালতে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন তথ্য সংগ্রহসংক্রান্ত কয়েকটি উদ্যোগ আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে।


বিচার বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি ১৯৯৬ সালের একটি ফেডারেল আইনের ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ওই আইনের আওতায় অঙ্গরাজ্যগুলো নির্দিষ্ট ফেডারেল সহায়তা পায়। বিচার বিভাগের নতুন ব্যাখ্যা হলো, আইনে যখন অঙ্গরাজ্যের কথা বলা হয়েছে, তখন শুধু নির্দিষ্ট একটি সরকারি দপ্তর নয়, বরং পুরো অঙ্গরাজ্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে বোঝানো হয়েছে। ফলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, মোটরযান অধিদপ্তর বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার কাছে কোনো ব্যক্তির অভিবাসন মর্যাদা সম্পর্কে তথ্য থাকলে সেটিও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 


এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে অঙ্গরাজ্যের সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর। উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৯টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসি এমন অভিবাসীদের চালকের লাইসেন্স দেওয়ার অনুমতি দেয়, যাদের বৈধ অভিবাসন মর্যাদা নেই। ফলে মোটরযান সংস্থার কাছে এমন ব্যক্তিদের পরিচয় ও যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য থাকতে পারে। নতুন ফেডারেল অবস্থান অনুযায়ী এসব তথ্যের কিছু অংশ ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।


একই ধরনের প্রশ্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও ঘিরে উঠতে পারে। কিছু অঙ্গরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈধ অভিবাসন মর্যাদা নেই এমন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে শিক্ষার্থীদের পরিচয়, ঠিকানা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক তথ্য থাকে। নতুন নীতির ফলে কোন তথ্য ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া যাবে, কোন তথ্য দেওয়া যাবে না এবং গোপনীয়তার সীমা কোথায়—এ নিয়ে নতুন আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।


ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দিচ্ছে, ফেডারেল সরকার অভিবাসন আইন কার্যকর করার দায়িত্ব পালন করছে এবং অঙ্গরাজ্য সরকারের হাতে থাকা তথ্য সেই প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের দৃষ্টিতে, কোনো অঙ্গরাজ্য যদি ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেয়, তাহলে ফেডারেল আইনের নির্দিষ্ট শর্ত মানার দায়িত্বও তাদের রয়েছে। বিচার বিভাগের আইনগত মতামত সেই অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। সূত্র: রয়টার্স।


অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলো এই নীতির বিরোধিতা করতে পারে। তাদের অন্যতম যুক্তি হতে পারে, ফেডারেল অর্থায়নের শর্ত ব্যবহার করে অঙ্গরাজ্য সরকারকে অভিবাসন আইন প্রয়োগে বাধ্য করা কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করছে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন অভিবাসন তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। ফলে এই নতুন অবস্থানও আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


অর্থের বিষয়টি এই বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে। বিচার বিভাগের মতামতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দুটি ফেডারেল কর্মসূচির মধ্যে একটি হলো দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য অস্থায়ী সহায়তা কর্মসূচি, যার বার্ষিক ফেডারেল অনুদান ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অন্যটি হলো সামাজিক নিরাপত্তা আয় কর্মসূচি, যেখানে ফেডারেল সুবিধার পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ সরকারের সতর্কতা বাস্তবায়িত হলে অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্য আর্থিক ঝুঁকি ছোট নয়। 


তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, বৈধ অভিবাসন মর্যাদা নেই এমন ব্যক্তিরা সাধারণভাবে ওই দুটি কর্মসূচির ফেডারেল সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। প্রশাসনের যুক্তি হচ্ছে, এসব কর্মসূচিতে অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে ফেডারেল সরকারের যে আইনি সম্পর্ক রয়েছে, তার আওতায় অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্যের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এই ব্যাখ্যাই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।


ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। সীমান্তে কঠোর নজরদারি, বহিষ্কার অভিযান, অভিবাসীদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ফেডারেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা বাড়ানো—এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রশাসন অবৈধ অভিবাসন কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে। নতুন তথ্য-প্রতিবেদন নীতি সেই বৃহত্তর কর্মসূচির আরেকটি অংশ। 


এই নীতির সমালোচকেরা বলছেন, সরকারি সেবার সঙ্গে অভিবাসন তথ্যকে যুক্ত করলে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য দিতে ভয় পেতে পারেন। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন, মোটরযান অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য সরকারি সংস্থায় দেওয়া তাঁর তথ্য পরে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারে, তাহলে তিনি ওই সরকারি সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। এতে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমেও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।

অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলো সাধারণত এ ধরনের তথ্য আদান-প্রদানের বিরুদ্ধে যুক্তি দেয় যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অভিবাসন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব আলাদা রাখা প্রয়োজন। তাদের মতে, একজন ব্যক্তি স্থানীয় সরকারি সেবা নিতে গেলে তাঁর অভিবাসন মর্যাদা সবক্ষেত্রে তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত নয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ফেডারেল আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈধ তথ্য ব্যবহার করা সরকারের দায়িত্বের অংশ।


আইনি লড়াইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা। চালকের লাইসেন্স, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড বা সরকারি সহায়তার তথ্যের মধ্যে ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য থাকতে পারে। কোন তথ্য ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো যাবে এবং কোন তথ্য গোপন রাখতে হবে—এই সীমা আদালতের আলোচনায় আসতে পারে।

এখন পর্যন্ত বিচার বিভাগের প্রকাশিত মতামতকে আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখা যাবে না। এটি সরকারের আইনগত ব্যাখ্যা। অঙ্গরাজ্যগুলো যদি এই ব্যাখ্যা চ্যালেঞ্জ করে, তাহলে ফেডারেল আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে যে ১৯৯৬ সালের আইন এবং সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে ফেডারেল সরকার কতটা চাপ প্রয়োগ করতে পারে। 


এই ঘটনায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ ও অবৈধ—দুই ধরনের অভিবাসন অবস্থার মানুষ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন। বিশেষ করে যেসব অঙ্গরাজ্যে অভিবাসীদের জন্য চালকের লাইসেন্স বা অন্যান্য স্থানীয় সুবিধা রয়েছে, সেখানে সরকারি তথ্যের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।


তবে এখনই এমন কোনো দাবি করা ঠিক হবে না যে যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্য থেকে লাখ লাখ অভিবাসীর তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি নির্ভর করবে ফেডারেল সরকারের প্রয়োগ, অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রতিক্রিয়া, তথ্যের ধরন এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।


সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন আইনগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর চাপ তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে থাকা বৈধ মর্যাদা না থাকা অভিবাসীদের তথ্য ফেডারেল সরকারের সঙ্গে ভাগ করার বিষয়ে নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তা না মানলে গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল অর্থায়ন হারানোর ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।


তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তিতে পৌঁছায়নি। অঙ্গরাজ্যগুলো আদালতে গেলে বিচারকদের সামনে প্রশ্ন উঠবে—ফেডারেল সরকার কি কল্যাণমূলক অর্থায়নের শর্ত হিসেবে অঙ্গরাজ্যের সরকারি সংস্থাগুলোকে অভিবাসন তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহে বাধ্য করতে পারে? সেই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের মার্কিন অভিবাসন নীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর