সরকার বন্ধের আশঙ্কা আপাতত শেষ, ডিসেম্বর পর্যন্ত ফেডারেল সরকার চালু রাখলেন ট্রাম্প
নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে সরকার বন্ধের আশঙ্কা এড়ানো গেল, নতুন তহবিল বিলে স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
সরকার বন্ধের আশঙ্কা আপাতত শেষ, ডিসেম্বর পর্যন্ত ফেডারেল সরকার চালু রাখলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য সরকারি অচলাবস্থার আশঙ্কা আপাতত কেটে গেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ সেপ্টেম্বর একটি স্বল্পমেয়াদি সরকারি অর্থায়ন বিলে স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন দপ্তর আগামী ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থায়ন পাবে এবং ১ অক্টোবর নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার পরপরই সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত দূর হয়েছে। বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, কারণ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আরেকটি সরকার বন্ধ হলে সেটি দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের জন্যই বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারত।
কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ১ সেপ্টেম্বর ৩৭০-৪৮ ভোটে এই স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থা অনুমোদন করে। এর আগে সিনেটও বিলটির অনুমোদন দিয়েছিল। ফলে ট্রাম্পের স্বাক্ষরের পর আইনটি কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে ফেডারেল সংস্থাগুলো আপাতত আগের অর্থায়নের কাঠামোর আওতায় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে। তবে এই আইন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বাজেট সমস্যার সমাধান করছে না। এটি মূলত কংগ্রেসকে আরও সময় দিচ্ছে যাতে তারা পূর্ণাঙ্গ অর্থবছরের ব্যয় বিলগুলো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের অর্থায়ন সাধারণত ১২টি পৃথক বার্ষিক ব্যয় বিলের মাধ্যমে করা হয়। এসব বিলের আওতায় প্রতিরক্ষা, আবাসন, জ্বালানি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, পরিবহনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু চলতি সময়ে কংগ্রেস এখনো এসব পূর্ণাঙ্গ ব্যয় বিল চূড়ান্ত করতে পারেনি। ফলে স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন বিলের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে দলীয় বিভাজন ও বাজেট নিয়ে মতবিরোধ ইতিমধ্যেই একাধিকবার সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত করেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই মেয়াদে আংশিক সরকারি বন্ধের ঘটনা মোট ১৬১ দিন পর্যন্ত গড়িয়েছে। নতুন করে সরকার বন্ধ হলে নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে সেটি রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারত বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।
সরকার বন্ধ হলে সব সরকারি কার্যক্রম একসঙ্গে থেমে যায় না। জরুরি বলে বিবেচিত কার্যক্রম চালু থাকতে পারে, কিন্তু অনেক কর্মচারী ছুটিতে যেতে পারেন, কিছু প্রশাসনিক সেবা ধীর হয়ে যেতে পারে এবং সরকারি অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অভিবাসন, পাসপোর্ট, ভ্রমণ, সরকারি চাকরি এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই কারণেই ডিসেম্বরের ১১ তারিখটি এখন নতুন গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে সামনে এসেছে। কংগ্রেসের হাতে কয়েক মাস সময় থাকলেও রাজনৈতিক সমঝোতা সহজ হবে না। নভেম্বরের ৩ তারিখের মধ্যবর্তী নির্বাচন বাজেট আলোচনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেলে ডিসেম্বরের বাজেট আলোচনাও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জাতীয় ঋণের মুখোমুখি হয়েছে। একই সময়ে সরকারের সুদ ব্যয়, ঘাটতি এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে শুধু সরকার চালু রাখাই নয়, দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ব্যয় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
রিপাবলিকানদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তারা নির্বাচনের আগে সরকার বন্ধের সরাসরি দায় এড়াতে পেরেছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—সরকারি ব্যয়ের ওপর তাদের অবস্থান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরোধিতা কীভাবে ভোটারদের সামনে তুলে ধরা হবে।
তবে রাজনৈতিক সংঘাত এখানেই শেষ হচ্ছে না। ডিসেম্বরের আগে কংগ্রেসকে পূর্ণাঙ্গ অর্থায়ন বিল পাস করতে হবে। সেখানে প্রতিরক্ষা ব্যয়, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, সামাজিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য সরকারি খাতে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই ২ সেপ্টেম্বরের স্বাক্ষরকে স্থায়ী সমাধান নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বিরতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার এখন চলছে, সরকারি কর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ফেডারেল সংস্থাগুলো অর্থ পাচ্ছে। কিন্তু কয়েক মাস পর আবার একই প্রশ্ন সামনে আসতে পারে—কংগ্রেস কি এবার দীর্ঘমেয়াদি বাজেট সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে?
নভেম্বরের নির্বাচন সেই প্রশ্নের উত্তরকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ নির্বাচনের ফলাফল শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নয়, আগামী কয়েক মাসের বাজেট রাজনীতির দিকও নির্ধারণ করবে। তাই ১১ ডিসেম্বর এখন শুধু একটি অর্থায়নের শেষ তারিখ নয়; এটি হয়ে উঠেছে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমঝোতার নতুন পরীক্ষা।