নেপালের ভয়াবহ বন্যায় জলবিদ্যুৎ বিপর্যয়, বাংলাদেশে বন্ধ ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ

নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশে নেপাল থেকে আসা ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।

নেপালের ভয়াবহ বন্যায় জলবিদ্যুৎ বিপর্যয়, বাংলাদেশে বন্ধ ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ

নেপালের ভয়াবহ বন্যায় জলবিদ্যুৎ বিপর্যয়, বাংলাদেশে বন্ধ ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ


নেপালের উত্তরাঞ্চলে ২৬ আগস্ট আঘাত হানা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা এখন শুধু মানবিক বিপর্যয়েই সীমাবদ্ধ নেই; দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামোতেও বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ভয়াবহ স্রোতে একের পর এক সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপরও।

নেপাল থেকে বাংলাদেশে চলতি বছরের জুন থেকে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আসছিল। ভারতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ চালু থাকার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ভয়াবহ বন্যায় নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামোর ক্ষতি হওয়ায় বাংলাদেশে সেই বিদ্যুৎ সরবরাহ আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে।

বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভোতে কোশি নদীর ভয়াবহ স্রোতে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ খাতের প্রতিবেদনে ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ প্রভাবিত হয়েছে।

আরও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় অন্তত ১২টি বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ জমে যাওয়ায় সেখানে আটকে পড়া কর্মীদের উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষতির পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপালের নিজস্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

এই দুর্যোগের মাত্রা বোঝা যায় প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যাতেও। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যাটি হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহ ধস ও তার পরবর্তী বিপুল জল, বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী, হেলিকপ্টার ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

বন্যার পানির সঙ্গে ধেয়ে আসা পাথর ও কাদার স্রোত বহু সেতু, রাস্তা, বসতবাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। ফলে দুর্গম এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষতি নেপালের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

নেপালের জন্য জলবিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে দেশটি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানি করতে পারে। বাংলাদেশও সেই বিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে নেপালের জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এবারের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেই বিদ্যুৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাকেই সাময়িকভাবে ব্যাহত করেছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য এটিকে বড় ধরনের জাতীয় বিদ্যুৎ সংকট হিসেবে দেখার কারণ নেই। কারণ নেপাল থেকে বাংলাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছিল ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ—যা বাংলাদেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় খুবই অল্প। মূল বিষয় হলো, নেপালের জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির কারণে দুই দেশের মধ্যে শুরু হওয়া আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হবে। তবে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার কারণে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে সময় লাগতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলন, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনায় আরও শক্তিশালী দুর্যোগ-সহনশীল ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।

সব মিলিয়ে, ২৬ আগস্টের বন্যা নেপালের জন্য একযোগে মানবিক, অবকাঠামোগত ও জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। আর সেই বিপর্যয়ের ঢেউ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশেও পৌঁছেছে—যার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর