মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর ডাক শি জিনপিংয়ের, বাড়ছে চীনের প্রভাব
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে মিসর সফরে শি জিনপিং, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাবে বাড়ছে চীনের কূটনৈতিক ভূমিকা।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর ডাক শি জিনপিংয়ের, বাড়ছে চীনের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত যখন আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে, তখন চীন এই অঞ্চলে নিজের কূটনৈতিক ভূমিকা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২ সেপ্টেম্বর মিসর সফর করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শির এই সফর কয়েক বছর পর মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উপস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মিসরের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কৌশলগত প্রভাব আরও শক্তিশালী করা।
মিসর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। একই সময়ে মিসর চীনের সঙ্গেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। ফলে কায়রো এখন দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল অনুসরণ করছে।
শির সফরের সময় মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, তথ্যকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর মতো খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহের ওপর চীনের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বেইজিংয়ের সরাসরি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া চীনের জন্যও উদ্বেগের কারণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনে এই জলপথের গুরুত্ব এত বেশি যে এখানে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে এশিয়ার শিল্প ও পরিবহন খাতও প্রভাবিত হতে পারে।
এই বাস্তবতায় শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে ‘বাইরের হস্তক্ষেপ’ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। চীনের প্রস্তাবিত নিরাপত্তা কাঠামোর মূল ধারণা হলো আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে আরও বেশি সমন্বয় তৈরি করা।
তবে চীনের এই উদ্যোগকে শুধু শান্তি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে বেইজিংয়ের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান নিরাপত্তা শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতির প্রতি কিছু মিত্র দেশের উদ্বেগ তৈরি হলে চীন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে।
চীন ইতোমধ্যে মিসরের সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। অবকাঠামো, উৎপাদন, সবুজ জ্বালানি এবং শিল্প স্থাপনে চীনা কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি বাড়ছে। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক সম্পর্কও শক্তিশালী হচ্ছে।
মিসরের জন্যও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়। একই সঙ্গে সুয়েজ খালকে কেন্দ্র করে মিসরের ভূকৌশলগত গুরুত্ব চীনকে দেশটির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়তে উৎসাহিত করছে।
সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এই সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তেল, গ্যাস, জাহাজ চলাচল, বীমা এবং সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। চীন তাই একদিকে কূটনৈতিকভাবে স্থিতিশীলতার কথা বলছে, অন্যদিকে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থও রক্ষা করতে চাইছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প সামরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে, এমন দাবি করা ঠিক হবে না। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, নৌবাহিনী এবং মিত্রজোটের যে বিস্তৃত কাঠামো রয়েছে, তার সমতুল্য ব্যবস্থা চীনের নেই। তবে অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং কূটনীতির মাধ্যমে বেইজিংয়ের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে।
এ কারণেই শির মিসর সফরকে অনেক বিশ্লেষক বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ, রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে চীন নিজের কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখন চীনের সক্রিয় উপস্থিতি এই সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তবে শির প্রস্তাবিত নতুন নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তা স্বার্থ, ইরান–ইসরায়েল সম্পর্ক, সৌদি আরব ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে শির মিসর সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সফর নয়। এটি এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চীন সেই অস্থিরতার মধ্যে নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।